এক ধাক্কায় সব ছেড়ে আধ্যাত্মিকতার খোঁজে! পাকিস্তানের খাইবার উপত্যকায় ভাইরাল প্রাক্তন রেসারের রহস্যময় জীবন।

দুনিয়ার কিছু মানুষ সারা জীবন রেকর্ড, খ্যাতি আর গতির পেছনে ছুটে বেড়ান, কিন্তু অনেকেই সব কিছু হাতের মুঠোয় পাওয়ার পর আচমকাই সেই ইঁদুরদৌড় থেকে নিজেদের চিরতরে গুটিয়ে নেন। স্পেনের প্রাক্তন মোটো২ (Moto2) রেসার এক্সেল পন্স-এর (Axel Pons) জীবনকাহিনিও ঠিক তেমনই এক অভাবনীয় পরিবর্তনের গল্প। দুবারের ২৫০ সিসি ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন সিতো পন্সের ছেলে এক্সেল একসময় ট্র্যাকের বুকে ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে বাইক ছুটিয়ে তাক লাগিয়ে দিতেন। কিন্তু আজ তিনি একেবারে অন্য মানুষ—পায়ে চটি বা জুতোটুকুও নেই, পিঠে একটি সাধারণ ব্যাগ ঝুলিয়ে এবং নিজের নাম বদলে ‘ইসা’ রেখে শান্তির খোঁজে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং চিত্রাল উপত্যকায় তাঁর নগ্নপায়ে ঘোরার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার পরেই তাঁর এই অদ্ভুত জীবন বদলের গল্প প্রকাশ্যে আসে।
চ্যাম্পিয়ন পরিবারের উত্তরাধিকার ও রেসিং ক্যরিয়ার
১৯৯১ সালের ৯ এপ্রিল বার্সেলোনায় জন্মগ্রহণকারী এক্সেল পন্সের শৈশব কেটেছিল রেসিং ট্র্যাক আর ট্রফির ভিড়ে। পড়াশোনার ক্ষেত্রে তিনি বার্সেলোনার লা সালে ইউনিভার্সিটি থেকে বিজনেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিগ্রিও অর্জন করেন। ২০০৮ সালে ১২৫ সিসিতে তাঁর অভিষেক হয় এবং ২০১০ সাল থেকে তিনি নিয়মিত মোটো২ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ ছিলেন। নিজের ১০ বছরের পেশাদার কেরিয়ারে তিনি মোট ১৪৪টি গ্র্যান্ড প্রিক্স রেসে অংশ নিয়ে ১৭৯ পয়েন্ট সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ইতালির মুগেলোয় অর্জিত ষষ্ঠ স্থানটি ছিল তাঁর ক্যরিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স। মার্ক মার্কেজ, ফ্রান্সেস্কো বগানিয়া, মাভেরিক ভিনালের মতো বিখ্যাত ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন রাইডারদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রেস করেছেন তিনি। বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্যরিয়ারের মধ্যগগনে তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ (Net Worth) ছিল ৫০ কোটি টাকারও বেশি!
২৬ বছর বয়সে কেন সব ছেড়ে দিলেন?
২০১৭ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে আচমকাই রেসিং জগৎকে চিরবিদায় জানান এক্সেল। কিছুদিন মডেলিং এবং সম্পূর্ণ নিভৃত জীবন কাটানোর পর থেকেই তিনি জীবনের তথাকথিত চাকচিক্য আর গতির দৌড় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন যে তিনি নিজের জীবনকে অত্যন্ত ধীরগতির করে তুলতে চেয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি ভীষণ শান্তভাবে প্রতিটি মুহূর্ত কাটাতে পছন্দ করেন এবং জীবনের ছোট ছোট খুঁটিনাটি অনুভব করতে ভালোবাসেন।
১৫ মাসে ১০ দেশের সফর ও পাকিস্তানের ঠিকানা
২০২৩ সালে একটি বড় ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে স্পেনের ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন এক্সেল। কোনো জুতো ছাড়া, কোনো বিলাসবহুল হোটেল বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই তিনি পায়ে হেঁটে প্রায় ১৫ মাসে ১০টি দেশের সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে পৌঁছান। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল খালি পায়ে হেঁটে মাটি এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিজের আত্মাকে যুক্ত করা। আসল পরিকল্পনা ছিল ভারতে পায়ে হেঁটে প্রবেশ করা, তবে ভিসার নানা জটিলতার কারণে তাঁর যাত্রাপথ পাকিস্তানের দিকে মোড় নেয়। পাকিস্তানের চিত্রাল ও কৈলাশ উপত্যকার সাধারণ মানুষের আন্তরিকতা, সহজ সরল জীবনযাত্রা এবং আতিথেয়তা তাঁকে এতটাই মুগ্ধ করে যে তিনি সেখানেই সাময়িকভাবে আস্তানা গেড়েছেন।