আইভিএফ প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী সাফল্য! বিশ্বে প্রথম জন্মাল অসমের দেশীয় গরুর বাছুর

দেশের পশুপালন ক্ষেত্রে এক নতুন ইতিহাস লিখল অসম। বিশ্বে এই প্রথমবার ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফ (IVF) পদ্ধতিতে জন্মাল অসমের একমাত্র নথিভুক্ত দেশীয় গরু ‘লখিমী’ প্রজাতির স্ত্রী বাছুর। এই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘটনাটি ঘটেছে গুয়াহাটির খানাপাড়ায় অবস্থিত অসম ভেটেরিনারি ও ফিশারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যাধুনিক আইভিএফ ল্যাবরেটরিতে। গত ২২ আগস্ট, শনিবার জন্ম নেওয়া এই বাছুরটি দেশের বায়োটেকনোলজি ও পশুপালন ক্ষেত্রে এক বিশাল মাইলফলক স্থাপন করেছে। এই বিশেষ ল্যাবটি তৈরি করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় গোকুল মিশন (RGM) এর আর্থিক সহায়তায়।

কীভাবে সম্পন্ন হলো এই অসাধ্য সাধন? গবেষক ও বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে একটি বিশুদ্ধ লখিমী গাভীর ডিম্বাণু এবং একটি বিশুদ্ধ লখিমী ষাঁড়ের শুক্রাণু সংগ্রহ করে ল্যাবের ভেতরেই ভ্রূণ তৈরি করা হয়। এরপর সেই ভ্রূণটি সফলভাবে একটি সংকর জাতের গাভীর গর্ভে প্রতিস্থাপন করা হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেখান থেকেই সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেয় এই কৌতূহলোদ্দীপক বাছুরটি। এই সফল গবেষণার পুরো নেতৃত্বে ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. মঞ্জ্যোতি ভূঁঞা। তাছাড়া তাঁর সঙ্গে এই কাজে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন ড. মান্না বারুটি ও ড. রাজু ডেকা। বিজ্ঞানীদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম আজ সারা দেশের নজর কেড়েছে।

কেন এই আবিষ্কার আধুনিক কৃষিক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ? বিশেষজ্ঞদের মতে, লখিমী হলো অসমের একটি ঐতিহ্যবাহী দেশীয় ও ডুয়াল পারপাস গরু। এই প্রজাতিটি এখানকার প্রতিকূল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ায় অত্যন্ত ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে এবং এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বেশি। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজের এক্স (X) হ্যান্ডেলে এই খুশির খবর শেয়ার করে লিখেছেন, “আজ অসম ঐতিহাসিক কিছু অর্জন করেছে— সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সৃজনের এক সুন্দর মিলন।” তিনি আরও যোগ করেন, “সে হয়তো ছোট্ট একটি বাছুর হতে পারে, কিন্তু সে আমাদের রাজ্যে বায়োটেকনোলজির জন্য এক বিশাল এবং গর্বের মাইলফলক বহন করছে।”

বিজ্ঞানীদের মতে, আইভিএফ প্রযুক্তির এই সফল প্রয়োগের ফলে বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী সুবিধা মিলবে। প্রথমত, এর মাধ্যমে অবলুপ্তির পথে থাকা দেশীয় প্রজাতির নিখুঁত সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, উন্নত জিনের গরুর সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ানো যাবে। তৃতীয়ত, রাজ্যজুড়ে দুধের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং গবাদি পশুর রোগ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এর ফলে দিনশেষে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন সাধারণ কৃষকরা এবং বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে তাঁদের গ্রামীণ আয়।

উল্লেখ্য, এর আগে গত মার্চ মাসে ঠিক এই বিশ্ববিদ্যালয়েই ‘গির’ প্রজাতির আইভিএফ বাছুরের সফল জন্ম হয়েছিল। তবে এবার অন্য রাজ্যের প্রজাতি নয়, বরং সম্পূর্ণ নিজেদের রাজ্যের দেশীয় প্রজাতি ‘লখিমী’র ওপর প্রয়োগ করে বিশ্বে প্রথমবার এক বিরল ইতিহাস গড়ল অসম। এই অভাবনীয় সাফল্যে উচ্ছ্বসিত গোটা রাজ্যের পশুপালন মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *