‘টাটা-রাই যেখানে ব্যর্থ, আমরা কে কোথাকার!’ রাজ্যজুড়ে বিনিয়োগ টানার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্ফোরক অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত

বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম বিজনেস টুডের ‘India@100’ ইভেন্টে যোগ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি, শিল্পোন্নয়নের চ্যালেঞ্জ এবং মেধা পাচার নিয়ে এক অত্যন্ত খোলামেলা ও বিস্ফোরক আলোচনা করলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। দীর্ঘদিনের আর্থিক অবনতির কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করে তিনি জানান, সঠিক নীতি ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমেই একমাত্র বাংলার হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একইসঙ্গে রাজ্যের শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক বেহাল দশা নিয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন তিনি।

এদিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যের মেধা এবং যুব সম্প্রদায়ের লাগাতার প্রস্থান নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, বাংলার প্রতিভাবান যুবসমাজ সারা বিশ্বে নিজেদের আলাদা পরিচিতি তৈরি করলেও তারা নিজ রাজ্যে থাকতে চাইছে না। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, কলকাতা শহরটি বর্তমান সময়ে কার্যত কেবল বয়স্ক ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষদের শহরে পরিণত হয়েছে। যুবসমাজ উচ্চশিক্ষা ও উন্নত কর্মসংস্থানের টানে স্থায়ীভাবে বেঙ্গালুরু, গুরুগ্রাম, নয়ডা কিংবা সুদূর বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে এবং বরাবরের জন্য রাজ্য ছাড়ছে।

বাঙালি সমাজ এবং ব্যবসা নিয়ে প্রচলিত মানসিকতা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানান, সাধারণ মানুষের মনে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে বাঙালিরা আদতে ব্যবসা-বিমুখ। এই মানসিকতার দ্রুত বদল ঘটানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এর পরই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে সিঙ্গুর থেকে টাটার প্রস্থান প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি বলেন, ‘টাটা-রাই যখন বাংলায় ব্যবসা করতে পারেনি, তখন আমরা কে কোথাকার!’ তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

রাজ্যের বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশের মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বপন দাশগুপ্ত। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যের ব্যবসায়িক উদ্যোগ ও মুক্ত চিন্তাকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। হতাশার এই পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের মনে নতুন আশার আলো জ্বালাতে হবে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীদের একটি নির্দিষ্ট অংশ মনে করেন বর্তমান পরিবর্তনটি সবচেয়ে খারাপ এবং তাঁরা কার্যত এই সরকারকে পছন্দ করেন না।

রাজ্যে বড় শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ যে অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ, তা অকপটে স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, সামগ্রিক ব্যবসায়িক নীতি সম্পূর্ণরূপে ভূমি সংস্কার এবং জমির সহজলভ্যতার ওপর নির্ভর করছে। বাংলায় জমি অধিগ্রহণ বরাবরই একটি জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমির খণ্ডগুলো ছোট হলেও তার মালিকানার আইন অত্যন্ত জটিল। এই সমস্যার সমাধানে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং ঝাড়গ্রামের মতো তুলনামূলক অনগ্রসর এলাকাগুলিতে বড় প্রজেক্টের জন্য জমি অধিগ্রহণ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি, কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ের কাছে নতুন শিল্প বেল্ট গড়ে তোলার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চলকেও নতুনভাবে পুনরুজ্জীবিত করা হবে।

ভবিষ্যতের বাংলা ঠিক কেমন হবে, সেই বিষয়ে কোনো অবাস্তব আশ্বাসের পথে হাঁটেননি অর্থমন্ত্রী। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে রাতারাতি কোনো অলৌকিক পরিবর্তন ঘটে যাবে না। তবে সরকার যে কাজের মাধ্যমে পরিবর্তন এনেছে, তা প্রমাণ করে দেখাবে। তাঁর আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা, আগামী চার বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ যদি ভারতের সর্বাধিক গ্রোথ রেট বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার অর্জন করতে পারে, তবে রাজ্যের ঐতিহাসিক গর্ব এবং আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ফিরে আসবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *