ছাত্র বিক্ষোভে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওড়ার সাফাই দিল্লি পুলিশের! সুপ্রিম কোর্টে জমা পড়ল বিস্ফোরক হলফনামা

নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নানা পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের প্রতিবাদে রাজধানীতে হওয়া ছাত্র বিক্ষোভের সময় দিল্লি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। সুপ্রিম কোর্টে সম্প্রতি একটি বিস্তারিত পাল্টা হলফনামা দাখিল করে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়েছিল।
ডেপুটি পুলিশ কমিশনার শচীন শর্মার দাখিল করা এই হলফনামায় জানানো হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং বাধ্য হয়েই পুলিশকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়। আদালতের নজরদারিতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে দায়ের হওয়া চারটি আবেদনের যৌথ জবাবে এই সাফাই দিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
‘অনিয়ন্ত্রিত ভিড় ও ব্যাপক সংঘর্ষ’
পুলিশের হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রায় ৫,০০০ পুলিশ কর্মী ৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৩০, হাজারেরও বেশি মানুষের বিশাল জনস্রোত সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ভিড় সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি হিংসাত্মক রূপ নেয়। এই সংঘর্ষে ২৪০ জনেরও বেশি পুলিশ কর্মী ও উর্দিধারী কর্মকর্তা এবং প্রায় ২০০ জন বেসামরিক নাগরিক ও বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
‘অনুমতিহীন মিছিল এবং সমাজবিরোধীদের অনুপ্রবেশ’
অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগকে নস্যাৎ করে পুলিশ জানিয়েছে, সংসদ অভিমুখে কোনো মিছিলের অনুমতি দেওয়া ছিল না। ফলে ওই জমায়েত সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল। এছাড়া বিক্ষোভে বহু সমাজবিরোধী এবং দাগী অপরাধীরাও অনুপ্রবেশ করেছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, আদালতে যে আবেদনগুলো জমা পড়েছে তা মূলত বাছাই করা কিছু ছবি, অসম্পূর্ণ ভিডিও ক্লিপ এবং স্বাধীনভাবে যাচাই না করা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা একপেশে চিত্র তুলে ধরে।
পেরেকযুক্ত লাঠি ও সাদা পোশাকের পুলিশ প্রসঙ্গে স্পষ্টীকরণ
বিক্ষোভের সময় পেরেকযুক্ত লাঠি ব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছে, তার জবাবে পুলিশ জানিয়েছে—ভিডিওতে লাঠি ব্যবহারের একটিমাত্র ঘটনা দেখা গেলেও সেটি পুলিশের হাতে ছিল না, বরং একজন বিক্ষোভকারীর হাতে ছিল। এছাড়া সাদা পোশাকের পুলিশ বা ‘স্পটার’-দের উপস্থিতি প্রসঙ্গে পুলিশ জানায়, বিপুল জনসমুদ্রের নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে স্পেশাল ব্রাঞ্চ, ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসারদের ভিড়ের মধ্যে মোতায়েন করা হয়েছিল, যা জাতীয় উৎসবের সময়েও নিরাপত্তার স্বার্থে করা হয়ে থাকে।
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ
পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীরা একাধিক স্তরের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে যে, বিক্ষোভকারীদের বড় দল একক পুলিশ কর্মীদের ওপর চড়াও হয়ে মারধর করছে, তাদের সুরক্ষা সরঞ্জাম কেড়ে নিচ্ছে এবং ফুটপাতে ফেলে টানহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, এই ঘটনায় প্রায় ২,৮৭৩ জন ব্যক্তি হত্যা, হত্যাচেষ্টা, ডাকাতি, ধর্ষণ এবং পকসো (POCSO)-র মতো গুরুতর ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দিল্লি পুলিশ কমিশনার একটি বিশেষ তদন্ত দল (SIT) গঠন করেছেন। পাশাপাশি, পুলিশের বলপ্রয়োগের বিষয়টি আদালত কর্তৃক নিযুক্ত কোনো কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করা হলেও তাতে পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
ফেসিয়াল রিকগনিশন সফটওয়্যার নিয়ে সাফাই
বিক্ষোভস্থলে মুখ শনাক্তকরণ (Facial Recognition) সফটওয়্যারের ব্যবহার নিয়ে সমালোচনার জবাবে পুলিশ জানিয়েছে এটি একটি পরিমিত ও আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা। এই সফটওয়্যার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে নজরদারি চালাতে বা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে ব্যবহৃত হয় না। শুধুমাত্র গুরুতর অপরাধের পূর্ব রেকর্ড রয়েছে এবং যাদের নাম নির্দিষ্ট তালিকায় আছে, কেবল তাদের শনাক্ত করতেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বলে হলফনামায় স্পষ্ট করেছে দিল্লি পুলিশ।