চিনের ধস আর ভারতের রমরমা! প্রপার্টি বাজারে ঘটে গেল বড় বদল, কোন দিকে এগোচ্ছে এদেশ?

বিশ্বের দুই এশীয় অর্থনৈতিক মহাশক্তির প্রপার্টি বাজারে বিপরীত ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে যখন চিনের সম্পত্তি বাজার দীর্ঘদিন ধরে গভীর সংকটের মধ্যে দিয়ে সংগ্রাম করছে, ঠিক তখনই ভারতের রিয়েল এস্টেট বাজার এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছানোর পথে। মরগান স্ট্যানলি ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল (MSCI)-এর আগস্ট ২০২৬-এর রিয়েল এস্টেট মার্কেট সাইজ রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের পেশাগতভাবে পরিচালিত রিয়েল এস্টেট বাজার ২০২৫ সালে ১০৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা এক বছরে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। উলটো দিকে, চিনের বাজার ১৮ বিলিয়ন ডলার সংকুচিত হয়ে ৯৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

পরিসংখ্যান কী বলছে?
এমএসসিআই বিশ্বের মোট ৩৮টি দেশের বাজার নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি দেশের প্রবৃদ্ধি ঘটলেও চীন, হংকং এবং ইন্দোনেশিয়ার বাজার সংকুচিত হয়েছে। এই তালিকায় ভারত ১৯তম স্থানে রয়েছে এবং বৈশ্বিক রিয়েল এস্টেট বাজারে ভারতের অংশ ০.৭৩% থেকে বেড়ে ০.৭৭% হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সময়ে ভারতীয় মুদ্রার প্রায় ৪.৭% অবমূল্যায়ন হওয়া সত্ত্বেও বাজারের এই জোলো প্রবৃদ্ধি সত্যিই নজরকাড়া।

চিনে কীভাবে শুরু হয়েছিল আবাসন সংকট?
২০২০ সালে চিনের আবাসন খাতে সংকটের সূত্রপাত হয়, যখন সরকার ডেভেলপারদের লাগামহীন ঋণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সেই সমস্যা ক্রমশ আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চিনের ৭০টি প্রধান শহরে নতুন বাড়ির দাম আগের বছরের তুলনায় ৩.২% কমে যায়। এটি ছিল টানা ৩২তম মাস ধরে গৃহস্থালির মূল্য হ্রাসের রেকর্ড। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে আবাসন খাতে বিনিয়োগ ১৬.২% হ্রাস পায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনের এই বিপর্যয়ের পেছনে বেশ কিছু প্রধান কারণ ছিল। অতিরিক্ত নির্মাণকাজ, জমি বিক্রির রাজস্বের ওপর স্থানীয় সরকারগুলির মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ডেভেলপারদের বাড়ি ক্রেতাদের অগ্রিম অর্থ দিয়ে নতুন জমি কেনার প্রবণতা পুরো বাজারকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এছাড়া প্রপার্টি ইজারা সংক্রান্ত নিয়মকানুনের অস্পষ্টতাও এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

ভারত কেন এগিয়ে রয়েছে?
চিনের তুলনায় ভারতের পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণ আলাদা। দেশের শীর্ষস্থানীয় রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলি বিগত কয়েক বছরে তাদের ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। তালিকাভুক্ত প্রধান ডেভেলপারদের গড় নেট ডেট-টু-ইকুইটি অনুপাত ২০১৭-১৫ অর্থবর্ষের ০.৫৫ থেকে কমে ২০২৫ অর্থবর্ষে মাত্র ০.০৫-এ নেমে এসেছে।

পাশাপাশি, রিয়েরা (RERA)-র কঠোর নিয়মকানুন ভারতে বাড়ি ক্রেতাদের জন্য একটি শক্তপোক্ত সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। এই আইন অনুযায়ী, ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থের অন্তত ৭০% একটি নির্দিষ্ট নির্মাণ-সম্পর্কিত এসক্রো অ্যাকাউন্টে রাখা বাধ্যতামূলক। এর ফলে ডেভেলপাররা ক্রেতাদের টাকা অন্য কোনো প্রকল্পে ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারে না।

কোথায় লুকিয়ে রয়েছে বিপদের আশঙ্কা?
ভারত সাময়িকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত নয়। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে দেশের সাতটি প্রধান শহরে বাড়ির বিক্রি ৬% কমে ৯০,৭১৫ ইউনিটে এসে ঠেকেছে। এর বিপরীতে প্রায় ১.০৬ লক্ষ নতুন বাড়ি বাজারে আনা হয়েছে। যার ফলে অবিক্রিত বাড়ির সংখ্যা বেড়ে ৬.১৬ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০% বেশি।

বিশেষ করে বিলাসবহুল এবং প্রিমিয়াম আবাসন বিভাগে অবিক্রিত ইনভেন্টরির পাহাড় দ্রুত বাড়ছে। যদি বিক্রির গতি মন্থর থাকে এবং নতুন বাড়ির সরবরাহ বাড়তে থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে ভারতীয় বাজারও মারাত্মক চাপের মুখে পড়তে পারে।

ভারতের জন্য কী ধরনের সতর্কতা জরুরি?
চিনের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতের উচিত শুধু বাড়ির চড়া দামের ওপর নির্ভর না করে অবিক্রিত সম্পত্তির পরিমাণের দিকেও কড়া নজর রাখা। ডেভেলপারদের ক্রেতাদের টাকায় যত্রতত্র জমি কেনার প্রবণতা কঠোর হাতে দমন করতে হবে এবং প্রতিটি রাজ্যে RERA-র নিয়মকানুন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ভারতের রিয়েল এস্টেট বাজার এই মুহূর্তে বেশ শক্তিশালী হলেও ভবিষ্যতের বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে এখনই সঠিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *