স্বাধীনতার দিন নামে না তেরঙ্গা! ভারতের এই গ্রামে গত ৮০ বছর ধরে ২৪ ঘণ্টা উড়ছে জাতীয় পতাকা

সাধারণত আমাদের দেশে স্বাধীনতা দিবস কিংবা প্রজাতন্ত্র দিবসের মতো জাতীয় উৎসবের দিনেই তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং সূর্যাস্তের আগেই তা সম্মানের সাথে নামিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু ভারতের এমন একটি গ্রাম রয়েছে, যেখানে এই নিয়মের সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম দেখা যায়। তেলেঙ্গানার ইয়াদাদ্রি জেলার রাজপেট মণ্ডলের বেগমপেট গ্রামে গত ৮০ বছর ধরে ২৪ ঘণ্টা, বছরের ৩৬৫ দিনই একটানা উড়ছে জাতীয় পতাকা। দেশের প্রতি এই গ্রামবাসীর অনন্য ভালোবাসা ও দেশপ্রেম আজ সারা দেশে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
যে ইতিহাস থেকে শুরু হয়েছিল এই ঐতিহ্য
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট, যেদিন ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে ভারত স্বাধীন হয়, সেই ঐতিহাসিক দিনেই এই বিশেষ ঐতিহ্যের সূত্রপাত ঘটেছিল। ওই দিন বেগমপেট গ্রামের তিনজন বীর স্বাধীনতা সংগ্রামী—বাদ্দাম নরসি রেড্ডি, বলজে ভিরাইয়া এবং চিগুল্লা মাল্লাইয়া—গ্রামের চত্বরে সমবেত হয়ে সগর্বে ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করেন। এটি কেবল স্বাধীনতা অর্জনের আনন্দ উদযাপন ছিল না, বরং দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলিও ছিল।
সেই থেকে গ্রামের মানুষ এক অবিচল প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। আশি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বদলে গেছে, কিন্তু বেগমপেটের আকাশে তেরঙ্গার পতপত করে ওড়া কখনো থামেনি।
পতাকার রূপ বদলায়, কিন্তু সংকল্প নয়
এই গ্রামে জাতীয় পতাকাকে কখনো নামিয়ে রাখা হয় না। তবে নিয়ম রক্ষার্থে প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস (১৫ অগস্ট), প্রজাতন্ত্র দিবস (২৬ জানুয়ারি) এবং বিজয়াদশমীর মতো পবিত্র দিনে গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিরা একত্রিত হন। অত্যন্ত সসম্মানে পুরনো বা কিছুটা জীর্ণ পতাকাটি নামিয়ে তার ঠিক জায়গাতেই সঙ্গে সঙ্গে একটি নতুন ও চকচকে ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করা হয়।
পূর্বপুরুষদের এই মহান আত্মত্যাগের স্মৃতি ও দেশপ্রেমের চেতনা নতুন প্রজন্মের মনে চিরজাগরূক রাখতে ১৯৭৯ সালে গ্রামের কেন্দ্রস্থলে মহাত্মা গান্ধীর একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়, যা আজও গ্রামবাসীর কাছে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
নতুন প্রজন্মের চোখে পূর্বপুরুষদের আদর্শ
গ্রামের প্রবীণ থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্ম—সবার কাছেই এই তেরঙ্গা নিছক কোনো কাপড়ের টুকরো নয়, বরং স্বাধীনতার জন্য পূর্বপুরুষদের করা সহ্য করা সীমাহীন কষ্ট ও ত্যাগের জীবন্ত প্রতীক। গ্রামবাসীদের মতে, সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলেছে, কিন্তু তাঁদের রক্তের সঙ্গে মিশে থাকা দেশপ্রেম ও মূল্যবোধ এক বিন্দুও কমেনি। সন্তানদের মনে এই জাতীয়তাবাদের চেতনা বাঁচিয়ে রাখাটাই তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় কর্তব্য। গত আট দশক ধরে অবিরাম উড়তে থাকা এই তেরঙ্গা প্রমাণ করে যে, বেগমপেটের মানুষের হৃদয়ে দেশের বীর শহিদরা চিরকাল অমর হয়ে আছেন।