শহিদ দীনেশ মজুমদারের জন্মভিটে কি এভাবেই হারিয়ে যাবে? বসিরহাটের ইছামতীর তীরে কালের গ্রাসে অগ্নিযুগের বিপ্লবীর স্মৃতি

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে দেশজুড়ে যখন দেশপ্রেমের জোয়ার ওঠে, তখন উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট থেকে এক গভীর আক্ষেপের সুর ভেসে আসে। ইছামতীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা যে বাড়িতে জন্মেছিলেন অগ্নিযুগের বিপ্লবী দীনেশচন্দ্র মজুমদার, আজ সেই ঐতিহাসিক জন্মভিটেই অস্তিত্বের সংকটে ধুঁকছে। শহিদের নামে রাস্তার নামকরণ হলেও তাঁর মূল স্মৃতির ঠিকানা আজ চরম অবহেলার শিকার।

ইতিহাসের পাতা থেকে ইছামতীর তীর
১৯০৭ সালের ১৯ মে বসিরহাটের ইছামতীর তীরে জন্ম নেওয়া দীনেশচন্দ্র মজুমদার তরুণ বয়সেই ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সংগঠন ‘যুগান্তর’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩০ সালের ২৫ অগস্ট কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে ব্রিটিশ পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টকে লক্ষ্য করে যে হামলা চালানো হয়, তার অন্যতম মূল নায়ক ছিলেন তিনি। সেই সংঘর্ষে বিপ্লবী অনুজাচরণ সেন শহিদ হন এবং গুরুতর আহত অবস্থায় দীনেশ গ্রেপ্তার হন।

মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকেও তাঁর বিপ্লবী চেতনাকে দমানো যায়নি। ১৯৩২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে জেলের সুউচ্চ প্রাচীর টপকে তিনি সফলভাবে পালিয়ে যান এবং ছদ্মবেশে অবিভক্ত উত্তর ২৪ পরগনায় পুনরায় বিপ্লব সংগঠিত করতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৩ সালের মে মাসে কলকাতার কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের এক গোপন আস্তানায় পুলিশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তিনি ধরা পড়েন এবং মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৩৪ সালের ৯ জুন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়।

রাস্তার নামবদল বনাম জন্মভিটের হাহাকার
স্থানীয় ‘শহিদ দীনেশ মজুমদার স্মৃতিরক্ষা কমিটি’ ও এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির মুখে বসিরহাটের পুরনো বোটঘাট রোডের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘শহিদ দীনেশ মজুমদার রোড’। নীল-সাদা ফলকে সেই নাম জ্বলজ্বল করলেও আসল সমস্যা অন্য জায়গায়। ইছামতীর পাড়ে তাঁর পৈতৃক বাড়িটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।

বাড়িটির পুরনো দেওয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে, প্লাস্টার খসে পড়ছে এবং ছাদ ও দেওয়ালের গায়ে গজিয়ে উঠেছে গাছের শিকড়। বর্ষার জল ও দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই কাঠামোটি আজ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

সংরক্ষণের জোরালো দাবি
ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের মতে, কেবল রাস্তার নামকরণে প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। অধ্যাপক ড. জগ্ননাথ দাস থেকে শুরু করে স্মৃতিরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অজয় বাইন এবং শিক্ষক প্রদীপ্ত সরকার—সকলেই একসুরে দাবি তুলেছেন যে, অবিলম্বে এই জন্মভিটাকে হেরিটেজ ঘোষণা করে সংরক্ষণ করা হোক। পাশাপাশি, সেখানে একটি স্মৃতি-সংগ্রহশালা ও লাইব্রেরি গড়ে তোলার দাবিও জোরালো হচ্ছে, যাতে নতুন প্রজন্ম এই শহিদের আত্মত্যাগের কথা জানতে পারে।

স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন একটا—যে যুবকের রক্তে লেখা হয়েছিল স্বাধীনতার ইতিহাস, তাঁর শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখার দায় কি বর্তমান সমাজের নয়? নীল-সাদা ফলকের চাকচিক্যের আড়ালে ইছামতীর পাড়ের এই ভগ্নপ্রায় বাড়িটিই একদিন বসিরহাটের স্বাধীনতা সংগ্রামের জীবন্ত পাঠশালা হয়ে উঠবে কি না, এখন সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *