ধূমপান ছাড়ার ভুয়া টোটকা নাকি বড় ফাঁদ? ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংয়ের নেশা যুবসমাজকে কোন সর্বনাশের দিকে ঠেলছে?

বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণী তথা ‘জেন জি’ (Gen Z) দের মধ্যে ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংয়ের (Vaping) ঝোঁক দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সাধারণ সিগারেটের ধূমপান যেমন ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, তেমনই ই-সিগারেটও কি ফুসফুসের প্রাণঘাতী ক্যানসারের কারণ হতে পারে? এই বিষয়ে কী মত বিশেষজ্ঞদের? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

সাধারণ সিগারেটের বিকল্প হিসেবে এবং ধূমপান ছাড়ার একটি ‘নিরাপদ উপায়’ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ই-সিগারেটের প্রচার চালিয়ে আসছে একটি বড় অংশ। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণার মতে, এই দাবির সপক্ষে যথেষ্ট জোরালো কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। উল্টে ফুসফুসের ওপর ই-সিগারেটের দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব এবং এর জেরে ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ই-সিগারেট ব্যবহার করেন, তাঁদের ফুসফুসে মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। বিশেষ করে যাঁরা সাধারণ সিগারেট ও ই-সিগারেট দুটোই সমানভাবে ব্যবহার করেন (যাঁদের ‘দ্বৈত ব্যবহারকারী’ বা Dual Users বলা হয়), তাঁদের ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকি আরও বহুলাংশ বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞের মতামত ও গবেষণার চাঞ্চল্যকর তথ্য: শেলবি ইন্টারন্যাশনাল হসপিটালের পালমোনোলজি বিভাগের প্রধান ড. শিবা কল্যাণ বিসওয়ালের মতে, ই-সিগারেটের বাষ্পে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ থাকে। এই উপাদানগুলি মানুষের শরীরের সুস্থ কোষ এবং ডিএনএ (DNA)-র মারাত্মক ক্ষতি করতে সক্ষম। পশুর ওপর চালানো বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, প্রায় এক বছর ধরে একটানা ই-সিগারেটের বাষ্পের সংস্পর্শে থাকার ফলে পরীক্ষাগারের ইঁদুরদের শরীরেও ফুসফুসের ক্যানসার বাসা বেঁধেছে।

এছাড়া ই-সিগারেটের লিকুইড বা তরলে থাকা প্রোপিলিন গ্লাইকল এবং বেনজোয়িক অ্যাসিডের মতো উপাদান ফুসফুসের ভেতরে তীব্র জ্বালা, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ (Inflammation) এবং কোষের ব্যাপক ক্ষতি করে। এমনকি যাঁরা অতীতে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁরাও যদি পরবর্তীতে ভ্যাপিংয়ে আসক্ত হন, তবে তাঁদের ক্ষেত্রেও ক্যানসারের ঝুঁকি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

ধূমপান ছাড়ার ভুল উপায়: অনেকেই মনে করেন সিগারেট ছাড়ার সেরা রাস্তা হলো ই-সিগারেট। কিন্তু বাস্তবে এর উলটো ফলই বেশি দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ব্যবহারকারীরা সাধারণ সিগারেট তো ছাড়তেই পারেন না, উল্টে ই-সিগারেটের সঙ্গে সাধারণ সিগারেট—দুটোই একসঙ্গে টানতে শুরু করেন। এর ফলে নিকোটিনের ওপর শারীরিক নির্ভরতা আরও বহুগুণ বেড়ে যায় এবং তাঁরা আগের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক রাসায়নিকের কবলে পড়েন। চিকিৎসকদের মতে, কয়েক দশক আগে ফিল্টারযুক্ত সিগারেটকে যেভাবে ‘নিরাপদ’ বলে বাজারে চালানো হয়েছিল এবং পরে তার ভয়াবহ পরিণতি সামনে এসেছিল, ই-সিগারেটের ইতিহাসও ঠিক সেই পথেই এগোচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *