“কর্মচারীদের মাইনে দিতে পারছি না, ১৭টি অফিসের খরচ মাসে ১ কোটি!” সুপ্রিম কোর্টে চরম বিপাকে তৃণমূল

তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার মামলাকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্টে একপ্রস্থ জোর আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (ED) আদালতে সম্পূর্ণ তথ্য পেশ করছে না বলে মঙ্গলবার শীর্ষ আদালতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূলের আইনজীবী তথা প্রবীণ কংগ্রেস নেতা কপিল সিব্বল (Kapil Sibal)।

মঙ্গলবার বিচারপতি এম. এম. সুন্দরেশ এবং বিচারপতি প্রসন্ন বি. ভারালের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি ছিল। শুনানির শুরুতেই তৃণমূল দল পরিচালনা করতে গিয়ে কী ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে, তার বিস্তারিত খতিয়ান আদালতের সামনে তুলে ধরেন কপিল সিব্বল।

ইডি-র যুক্তি ও কপিল সিব্বলের পাল্টা সওয়াল
শুনানি চলাকালীন ইডি-র আইনজীবী আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন যে, ফ্রিজ করা অ্যাকাউন্টগুলি বাদে তৃণমূলের অন্যান্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলিতে যে টাকা রয়েছে, তা দিয়েই তারা দলের যাবতীয় কাজ চালাতে পারে।

এই যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে কপিল সিব্বল আদালতে জানান:

“ওরা আমাদের বলছে বাকি অ্যাকাউন্টে ১৬৪ কোটি টাকা আছে, সেখান থেকেই খরচ করতে। কিন্তু যে ৩৬টি অ্যাকাউন্টের কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে ৩১টিই হলো ফিক্সড ডিপোজিট (Fixed Deposit) বা স্থায়ী আমানত। বাকি মাত্র ৫টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। যদি ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙা হয়, তবে সেই অর্থও সরাসরি বাজেয়াপ্ত হওয়া অ্যাকাউন্টে চলে যাবে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, এর মধ্যে আবার চারটি অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হয়েছে এবং ইডি আদালতকে সমস্ত সঠিক তথ্য দিচ্ছে না।

কর্মচারীদের মাইনে থেকে ১৭টি অফিসের খরচ— আদালতের সামনে তুলে ধরলেন সিব্বল
তৃণমূলের দৈনন্দিন কার্যনির্বাহী খরচ এবং অর্থনৈতিক সঙ্কটের কথা বলতে গিয়ে কপিল সিব্বল জানান যে, দলের স্বাভাবিক কাজকর্ম চালানো এই মুহূর্তে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালতে তিনি যা যা উল্লেখ করেছেন:

কর্মচারীদের বেতন বকেয়া: তৃণমূল কংগ্রেসে মোট আড়াইশো জন স্থায়ী কর্মচারী রয়েছেন, যাঁদের এ মাসের বেতন দেওয়া সম্ভব হয়নি। শুধুমাত্র বেতন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ প্রতি মাসে ৫৩ লক্ষ ২৩ হাজার টাকা প্রয়োজন।

অফিসের মাসিক খরচ: দলের ১৭টি অফিস মিলিয়ে শুধুমাত্র রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য কাজের জন্য প্রতি মাসে ১ কোটি টাকার ধাক্কা রয়েছে। চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োজিত সিকিউরিটি এজেন্সি এবং কর্মচারীদের পাওনা মেটানো যাচ্ছে না। এমনকি নির্বাচনের সময় যাঁরা কাজ করেছিলেন, তাঁদেরও বকেয়া টাকা দেওয়া বাকি রয়েছে।

এয়ারক্রাফ্ট কোম্পানির অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ: সিব্বল আদালতকে জানান যে, দলীয় কাজের জন্য তৃণমূল যে সংস্থা থেকে এয়ারক্রাফ্ট বা বিমান লিজ নিয়েছিল, সেই সংস্থার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ কীসের ভিত্তিতে বা কোন আইনি জোড়াগলায় এই পদক্ষেপ করা হলো, তা তদন্তকারী সংস্থা স্পষ্ট করছে না।

“৬০ কোটি টাকার অপরাধে ৪০০ কোটি টাকা ফ্রিজ!”
তদন্তকারী সংস্থার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত কড়াকড়ির অভিযোগ এনে কপিল সিব্বল প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের নিজেদের দাবি বা মামলা অনুযায়ী যদি ‘প্রসিড অফ ক্রাইম’ বা অপরাধলব্ধ অর্থের পরিমাণ মাত্র ৬০ কোটি টাকা হয়, তবে কেন ব্যাংকগুলিতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করে আটকে রাখা হয়েছে?

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ যখন প্রতিদিনের দলীয় কাজ পরিচালনার জন্য একজন প্রাক্তন বিচারপতিকে স্পেশাল অফিসার হিসেবে নিয়োগ করে কিছু টাকা ব্যবহারের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল, ঠিক সেই সময়ই নতুন করে আরও তিনটি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হয়। এখন দেখার আগামী দিনে এই আর্থিক টানাপোড়েনের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট কী নির্দেশ দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *