ঈশ্বরের আরাধনায় নিজের হাতে গাঁথা ফুলের মালা অর্পণ কি বাধ্যতামূলক? জানুন শাস্ত্রীয় মত ও বিশেষ নিয়ম

ঈশ্বর আরাধনায় পুষ্পার্ঘ্য বা পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হিন্দু সনাতন সংস্কৃতির অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র অঙ্গ। দেবী বা দেবতার বিগ্রহে টাটকা ও সুগন্ধি ফুলের মালা পরিয়ে ভক্তি নিবেদন করার এই রীতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তবে আধুনিক ও ব্যস্ততার যুগে বাজার থেকে কেনা রেডিমেড ফুলের মালার ব্যবহার বহুগুণ বাড়লেও, বহু ভক্তের মনেই একটি প্রশ্ন প্রায়ই উঁকি দেয়— বাজার থেকে কেনা মালা দেওয়া কি ভালো, নাকি নিজের হাতে পরম ভক্তিতে গাঁথা ফুলের মালা ঈশ্বরচরণে অর্পণ করা উচিত?
শাস্ত্রজ্ঞ ও পণ্ডিতদের অভিমত অনুযায়ী, বাজার থেকে কিনে আনা মালার চেয়ে নিজের হাতে সম্পূর্ণ নিষ্ঠা, ভক্তি ও ভালোবাসা দিয়ে প্রস্তুত করা ফুলের মালা ঈশ্বরচরণে অর্পণ করা সবসময়ই সবচেয়ে শুভ এবং শাস্ত্রসম্মত।
শাস্ত্র কী বলছে?
পুরাণ ও বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ভগবান বা ঈশ্বর কখনই কোনও পার্থিব বস্তুর বাহ্যিক মূল্যে সন্তুষ্ট হন না; তিনি কেবল ভক্তের একনিষ্ঠ ‘ভাব’ বা শুদ্ধ ভক্তিটুকুই গ্রহণ করেন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং বলেছেন—
“পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি…” অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ভক্তি সহকারে তাঁকে একটি পাতা, একটি ফুল, একটি ফল বা সামান্য জলও অর্পণ করেন, তিনি তা পরম প্রীতিভরে গ্রহণ করেন।
সুতরাং, বাজার থেকে টাকা খরচ করে কিনে আনা প্রথাগত মালার চেয়ে নিজের হাতে সময় ও ধৈর্য ব্যয় করে গাঁথা মালায় অনুভূতির স্পর্শ ও একাগ্রতা অনেক বেশি গভীর হয়।
নিজে হাতে মালা গাঁথার বিশেষ আধ্যাত্মিক ও শারীরিক উপকারিতা
মনঃসংযোগ ও ধ্যান: যখন কোনও ভক্ত নিজের হাতে ভগবানের জন্য মালা গাঁথেন, তখন তাঁর মন সমস্ত জাগতিক চিন্তা ও কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র ঈশ্বরের ধ্যানে মগ্ন থাকে। এই প্রক্রিয়াটিকে শাস্ত্রে একপ্রকার ‘মানসিক জপ’ বা ‘ধ্যান’ বলেই গণ্য করা হয়েছে।
পবিত্রতা রক্ষা: বাজার থেকে কেনা মালা তৈরির সময় পরিচ্ছন্নতা বা সুচিতার নিয়ম কতটা নিখুঁতভাবে মানা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের বাড়িতে ভক্ত যখন নিজে হাতে স্নান সেরে ও পরিষ্কার পরিচ্ছদ পরে মালা তৈরি করেন, তখন সম্পূর্ণ পবিত্রতা বজায় রাখা সম্ভব হয়।
নিজে হাতে ঠাকুরের মালা বানানোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
শাস্ত্র বিশেষজ্ঞরা ঠাকুরের জন্য নিজের হাতে মালা প্রস্তুত করার সময় কয়েকটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত কড়া নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন:
১. সবসময় হাত-পা ভালোভাবে ধুয়ে অথবা স্নান সেরে পবিত্র ও শুদ্ধ হয়ে মালা গাঁথতে বসুন।
২. পুজোর জন্য সর্বদা বাড়ির বা বাগানের টাটকা, সতেজ এবং অক্ষত ফুল ব্যবহার করা উচিত। বোঁটা ভাঙা, পোকা লাগা বা বাসি ফুল দেব-দেবীর চরণে নিবেদন করতে নেই।
৩. যে ফুল বা মালা ভগবানের সেবায় ব্যবহৃত হবে, তা তৈরি করার সময় তার সুবাস নিজে আগে শোঁকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকী, ফুল তোলা বা মালা গাঁথার সময় তাতে নিঃশ্বাসের সরাসরি স্পর্শ যাতে না লাগে, সেদিকেও বিশেষ নজর রাখা দরকার।
৪. মালা গাঁথার কাজে ব্যবহৃত ছুঁচ এবং সুতো সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও নতুন হওয়া বাঞ্ছনীয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ভক্তির মূল নির্যাস সবসময় লুকিয়ে থাকে নিখাদ ভালোবাসা ও সমর্পণের মধ্যে। বাজার থেকে কিনে আনা মহামূল্যবান উপকরণের চেয়ে নিজের হাতে নিপুণ যত্নে ও শ্রদ্ধায় গাঁথা সামান্য একছড়া ফুলের মালাও ভগবানের চরণে অনেক বেশি প্রিয়, পবিত্র এবং গ্রহণযোগ্য।