পরিষদীয় দল নয়, শেষ কথা বলবে রাজনৈতিক দলই! শিবসেনা মামলায় বিরাট পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের

বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, পরিষদীয় দলের ক্ষমতার চেয়ে রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণই অনেক বেশি শক্তিশালী। পরিষদীয় দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত এখানে শেষ কথা নয়, বরং রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তই সর্বাগ্রে বিবেচনা করা হবে। শিবসেনার শিবির বদল ও দল ভাঙন সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এমনই তাৎপর্যপূর্ণ মৌখিক পর্যবেক্ষণ পেশ করল সুপ্রিম কোর্ট।

দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহানার বিশেষ বেঞ্চে এই হাই-প্রোফাইল মামলার শুনানি চলছে।

মামলার নেপথ্য প্রেক্ষাপট
মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ভেঙে আগেই একনাথ শিন্ডে শিবির তৈরি হয়েছিল। সম্প্রতি লোকসভাতেও উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা ভেঙে বেশ কয়েকজন সাংসদ শিন্ডে শিবিরে যোগ দেন। এর পরেই ভারতীয় সংবিধানের দশম তফসিলে থাকা দলত্যাগ বিরোধী আইনের কথা উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন উদ্ধব শিবিরের নেতা সুনীল প্রভু। মহারাষ্ট্রের স্পিকার কেন তাঁদের দাবি মেনে দলবদলকারী সাংসদ ও বিধায়কদের পদ খারিজ করলেন না, সেই প্রশ্নই তোলা হয়েছে এই মামলায়।

পাশাপাশি, অপর একটি পৃথক মামলা দায়ের করেছেন উদ্ধব ঠাকরে নিজে। তাঁর মূল প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশন ঠিক কোন যুক্তিতে শিবসেনার মূল নাম ও ‘ধনুক-বান্দর’ প্রতীক শিন্ডে শিবিরকে ব্যবহারের অনুমতি দিল?

শুনানিতে কী বলল সুপ্রিম কোর্ট?
মামলার শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান,

“আইন অনুসারে রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ পরিষদীয় দলের থেকে বেশি। পরিষদীয় দলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তই হবে শেষ কথা।”

এর আগে মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকট ও শিবসেনার ভাঙন সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল যে, রাজ্যপালের আস্থা ভোটের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। তবে আস্থা ভোটের আগেই উদ্ধব ঠাকরে পদত্যাগ করায় সরকারের পতন আটকানোর সুযোগ ছিল না। সে প্রসঙ্গ টেনে বিচারপতি বাগচী এদিন আরও স্পষ্ট করেন যে, কোনও পরিষদীয় দল স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আসল দল কোনটি, তা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে কেবল পরিষদীয় দলের সংখ্যাগুরুতার বিশেষ কোনও আইনি গুরুত্ব নেই। নির্বাচন কমিশন পরিষদীয় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিচার করতে গিয়ে ভুল করেছে বলেও ইঙ্গিত দেয় আদালত।

কপিল সিব্বলের সওয়াল ও সংবিধানের মূল ভিত্তি
উদ্ধব শিবির তথা মামলাকারীদের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী কপিল সিব্বল আদালতে জোরালো সওয়াল করেন। তিনি দাবি করেন, একটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব সংবিধানের বৈধতা বিচার করা নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। তিনি মনে করিয়ে দেন, একনাথ শিন্ডেকে একসময় উদ্ধব ঠাকরেই দলনেতা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যাঁর হাত ধরেই পরবর্তীতে একাধিক বিধায়ক শিবির বদল করেন। সংবিধানের দশম তফসিল বা অ্যান্টি-ডিফেকশন ল’ অনুযায়ী ওই বিধায়কদের পদ খারিজ করা সম্ভব ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

সিব্বলের মন্তব্য, যেভাবে দেশের একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অন্য দলে চলে যাচ্ছেন এবং তার জেরে নির্বাচিত সরকার পড়ে যাচ্ছে, তা সরাসরি সংবিধানের মূল কাঠামোর পরিপন্থী।

এরপর প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন যে, নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট কোনও গাইডলাইনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংক্রান্ত কোনও স্পষ্ট নিয়ম বা নির্দেশিকা রয়েছে কি না। বিচারপতি বাগচীর প্রশ্নের উত্তরে সিব্বল জানান যে প্রতীক আদতে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলটিরই সম্পত্তি। এরপরই বেঞ্চের তরফে জানানো হয় যে, শুধুমাত্র পরিষদীয় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ভিত্তি ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা নির্বাচন কমিশনের ভুল পদক্ষেপ ছিল। এই মামলার পরবর্তী শুনানি বৃহস্পতিবার দুপুরে ফের ধার্য করা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *