টুলু মণ্ডলের সাম্রাজ্যে বড় ধাক্কা! উদ্ধার গোপনীয় ডায়েরি, ফাঁস হতে চলেছে হেভিওয়েট আধিকারিকদের নাম?

বীরভূমের পাথর ব্যবসাকে ঘিরে চলা দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অভিযোগে এবার এক বিরাট মোড় এল। টুলু মণ্ডল (Tulu Mondal) ওরফে নাজিবউদ্দিনের বেআইনি আর্থিক সাম্রাজ্যের সঙ্গে জড়িত বহু গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনের নথি এবং একটি গোপন ডায়েরি তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে দাবি পুলিশের। ধৃত ম্যানেজারের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ওই ডায়েরিকে কেন্দ্র করেই এখন গোটা মামলার তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ম্যানেজারের ডায়েরিতে কিসের হিসাব?
গত সোমবার টুলু মণ্ডলের ম্যানেজার সীতেশ প্রামাণিককে গ্রেফতার করে বীরভূম জেলা পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, তাঁর কাছ থেকেই ওই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডায়েরিটি উদ্ধার হয়েছে। যদিও পুলিশ সরাসরি এই নিয়ে মুখ খুলতে চায়নি, তবে আদালতে শুনানির সময় সরকারি পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্যে ওই ডায়েরির গুরুত্ব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। আদালতে জানানো হয়, টুলুর ব্যবসার যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিতভাবে ওই খাতায় লিখে রাখা হতো এবং এই পুরো দায়িত্বটি সামলাতেন ধৃত সীতেশ নিজেই।
তদন্তকারী সূত্রের দাবি, ডায়েরিতে কেবল পাথর ব্যবসার রুটিন হিসাবই নয়, বরং বিভিন্ন সরকারি আধিকারিকের সঙ্গে কথিত আর্থিক লেনদেনেরও বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। ব্যবসার লাভের মোটা অংশ ঠিক কার কার পকেটে বা কাদের কাছে পৌঁছত, তারও সুনির্দিষ্ট হিসাব সেখানে নথিভুক্ত রয়েছে বলে পুলিশের ধারণা।
নকল ডিসিআর (DCR) ছাপার যন্ত্র উদ্ধার
সীতেশ দীর্ঘদিন ধরে মহম্মদবাজার থানার পাঁচামি এলাকার একটি পাথর ক্রাশারে হিসাবরক্ষকের (Accountant) কাজ করতেন। গত ৩১ জুলাই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ই তদন্তকারীরা টুলু মণ্ডলের কথিত বেআইনি ব্যবসার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটির সন্ধান পান। এরপর তাঁকে গ্রেফতারের পর তাঁর কাছ থেকে আরও একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য ও নথি উদ্ধার হয়।
মহম্মদবাজারে টুলু মণ্ডলের একটি পার্কিং গ্রাউন্ডের ভেতরে অভিযান চালিয়ে পুলিশ একটি বিশেষ ছাপার যন্ত্র উদ্ধার করেছে। তদন্তকারীদের জোরালো অনুমান, ওই প্রিন্টিং মেশিন ব্যবহার করেই নকল ডিসিআর (ডুপ্লিকেট চালান রিসিপ্ট) ছাপানো হতো এবং সেই জাল নথির মাধ্যমেই রমরমিয়ে চলত বেআইনি পাথর ব্যবসা।
প্রশাসনিক আধিকারিকদের নাম সামনে আসার সম্ভাবনা
পুলিশ সূত্রে খবর, মামলার কেস ডায়েরির সঙ্গে ওই নথির একাধিক পাতার জেরক্স কপিও আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী মহলের দাবি, ডায়েরির পাতায় জেলার বর্তমান ও প্রাক্তন বহু ছোট-বড় প্রশাসনিক আধিকারিকের নাম ও কোড রয়েছে।
এই মামলার শুনানিতে জেলা পুলিশের বিশেষ আবেদনের ভিত্তিতে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায়কে বিশেষ সরকারি আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। আদালত চত্বরে তিনি বলেন, “ধৃত মিনার মণ্ডল এবং সদ্য ধৃত সীতেশ প্রামাণিককে জেরা করেই গোপন ছাপাখানা ও ডায়েরির সন্ধান মিলেছে। তদন্ত যত এগোবে, তত নতুন নতুন নাম সামনে আসতে পারে।”
বর্তমানে তদন্তকারীদের প্রধান লক্ষ্য হলো— ডায়েরিতে থাকা আর্থিক লেনদেনের প্রতিটি তথ্যের সত্যতা যাচাই করা। উদ্ধার হওয়া নথি, জাল চালান ছাপার যন্ত্র এবং অন্যান্য প্রমাণ একসঙ্গে মিলিয়ে এই বিশাল অপরাধচক্রের পরিধি ঠিক কতটা বিস্তৃত ছিল, সেটাই এখন খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।