বেসরকারি সংস্থার জন্য খুলে গেল পারমাণবিক খাতের দরজা! ভারত কি পারতে চলেছে ১০০ GW-র লক্ষ্য ছুঁতে?

কার্বন নির্গমন সমস্যা মোকাবিলা এবং দ্রুত বর্ধনশীল শক্তি-পিপাসু অর্থনীতির চাহিদা মেটাতে নরেন্দ্র মোদী সরকারের অন্যতম প্রধান ফোকাস হলো পারমাণবিক শক্তি (Nuclear Power)। সঠিক সুরক্ষা এবং প্রোটোকল মেনে চললে পরমাণু শক্তিই হতে পারে ভারতের ভবিষ্যৎ শক্তির মূল চাবিকাঠি। সম্প্রতি দেশের পারমাণবিক শক্তিক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলির প্রবেশের পথ উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকেই দেশের বড় বড় পাওয়ার ইউটিলিটিগুলি কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে। এনটিপিসি (NTPC), আদানি পাওয়ার (Adani Power) এবং টাটা পাওয়ার (Tata Power)-এর মতো শিল্পমহল দেশজুড়ে নতুন পারমাণবিক প্রজেক্টের জন্য উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশের পরমাণু শক্তি ক্ষমতা ১০০ GW (গিগাওয়াট)-এ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। ফলস্বরূপ, আগামী দিনে এই খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ ও দ্রুত সম্প্রসারণ দেখা যাবে।
এনটিপিসি-র নজরে ৩০টি সম্ভাব্য সাইট
মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের বৃহত্তম থার্মাল পাওয়ার উৎপাদক এবং প্রথমসারির রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এনটিপিসি অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থানে ৩০টিরও বেশি সম্ভাব্য সাইট চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই ১০টি স্থানে প্রাথমিক পর্যায়ের স্টাডি বা সমীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।
সংস্থার প্রথম বড় পারমাণবিক প্রজেক্টটি হলো রাজস্থানের ২.৮ GW মাহি বাঁশওয়াড়া নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট, যা NPCIL এবং NTPC-র যৌথ উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে।
২০৪৭ সালের মধ্যে ৩০ GW পারমাণবিক ক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে এনটিপিসি। সম্প্রতি জানানো হয়েছে, ২০৩৭ অর্থবর্ষের (FY37) মধ্যে এই খাতে প্রায় ১.২৮ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে।
ময়দানে নামছে আদানি পাওয়ার
দেশের বৃহত্তম বেসরকারি থার্মাল পাওয়ার কোম্পানি আদানি পাওয়ারও পারমাণবিক শক্তিক্ষেত্রে দ্রুত পা রাখছে। মধ্যপ্রদেশের বিনা এবং নিগ্রিতে সম্ভাব্য সাইটগুলি খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি। উল্লেখ্য, এই দুটি প্রজেক্ট আগে জয়প্রকাশ অ্যাসোসিয়েটসের মালিকানাধীন ছিল, যা পরবর্তীতে আদানি গ্রুপ অধিগ্রহণ করেছে।
পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে ‘আদানি অ্যাটমিক এনার্জি’ নামে একটি নতুন সহযোগী সংস্থাও তৈরি করেছে আদানি পাওয়ার।
ওড়িশায় প্রতিটি ২,৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা চলছে। এই প্রজেক্টগুলির জন্য প্রায় ১.৫ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব রাজ্য সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছে টাটা পাওয়ার
মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা এবং গুজরাটেও সম্ভাব্য প্রজেক্ট সাইট চিহ্নিত করেছে টাটা পাওয়ার। সংস্থার এমডি ও সিইও প্রবীর সিনহা জানিয়েছেন যে, এই স্থানগুলিতে বর্তমানে মাটি পরীক্ষা (soil testing) এবং প্রযুক্তিগত গবেষণা চলছে। আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে সংস্থাটি এই প্রজেক্টগুলি নিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পজিশনে থাকবে।
সরকারের কাছ থেকে বিস্তারিত নিয়মাবলী বা রেগুলেশন জারির পরই তাঁরা নির্মাণকাজ শুরু করতে আগ্রহী।
২০২৮ সালের শুরুর দিকে নির্মাণকাজ শুরু করে ২০৩৩ অর্থবর্ষের (FY33) মধ্যে প্রথম পারমাণবিক চুল্লি (nuclear reactor) চালু করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে টাটা পাওয়ার।
নতুন প্রযুক্তির সুবিধা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্ট মডিউলার রিয়েক্টর এবং আধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তি কম জমিতে অনেক বেশি নিরাপদ প্ল্যান্ট তৈরিতে সাহায্য করবে। এর ফলে জমি অধিগ্রহণ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় স্তরে অনুমোদনের মতো বড় বাধাগুলি এড়ানো সম্ভব হবে। সরকার যদি সময়মতো সঠিক নিয়মাবলী জারি করে এবং প্রজেক্টগুলিকে দ্রুত অনুমোদন দেয়, তবে ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের ১০০ GW পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে না।