রেশন কার্ড যাচাই ও দুর্নীতি দমন অভিযান, কী কী কারণে বাতিল হতে পারে রেশন কার্ড?

রেশন বন্টন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং কালোবাজারি পুরোপুরি রুখতে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ করেছে নতুন রাজ্য সরকার। গত সরকারের আমলে রেশন কার্ড বন্টন ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণে বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। সেই সমস্ত অনিয়ম কড়া হাতে দমন করতে এবার কোমর বেঁধে নেমেছে প্রশাসন। খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অতীতে যেভাবে মধ্যস্বত্বভোগীরা বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেছে, তা আর কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।

রেশন কার্ড যাচাই ও দুর্নীতি দমন অভিযান

জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের আওতায় দেশের দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলি অত্যন্ত কমমূল্যে বা বিনামূল্যে চাল, গম এবং অন্যান্য রেশন সামগ্রী পেয়ে থাকে। তবে বহু ‘অযোগ্য’ ও সচ্ছল মানুষ এই সুবিধার সুযোগ নেওয়ায় অসংখ্য প্রকৃত ও যোগ্য পরিবার রেশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। সেই অসঙ্গতি দূর করতেই রাজ্যজুড়ে উপভোক্তাদের রেশন কার্ড যাচাইয়ের বা স্ক্রুটিনির কাজ জোরকদমে শুরু হয়েছে। কেন্দ্রের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, অনেকেরই বার্ষিক আয় নির্ধারিত সীমার বেশি থাকা সত্ত্বেও তারা এতদিন রেশন তুলেছেন। এমনকি বহু ভুয়ো কার্ড তৈরি করা হয়েছে এবং মৃত ব্যক্তিদের নামেও রেশন তোলার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এই সমস্ত অনিয়ম ঠেকাতেই এই বিশেষ যাচাই পর্ব চলছে।

পশ্চিমবঙ্গে কী কী ধরনের রেশন কার্ড রয়েছে?

রাজ্যে মূলত বিভিন্ন ক্যাটাগরির রেশন কার্ডের মাধ্যমে খাদ্যসামগ্রী বন্টন করা হয়:

  1. অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা (AAY) কার্ড: সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণির বিপিত তালিকাভুক্ত পরিবারগুলিকে এই কার্ড দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে পরিবারপিছু বিনামূল্যে ২১ কেজি চাল, ১৩ কেজি ৩০০ গ্রাম আটা (বা ১৪ কেজি গম) এবং ১৩ টাকা ৫০ পয়সা কেজি দরে নির্দিষ্ট পরিমাণ চিনি দেওয়া হয়।

  2. বিশেষ অগ্রাধিকারযুক্ত পরিবার (SPHH) কার্ড: অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির মানুষের জন্য এই কার্ড। বার্ষিক ৪৪ হাজার থেকে ৫৯ হাজার বা ১.২ লক্ষ টাকা আয় থাকা পরিবারগুলি এর অন্তর্ভুক্ত। এর মাধ্যমে মাথাপিছু ৩ কেজি চাল এবং ১ কেজি ৯০০ গ্রাম আটা (বা ২ কেজি গম) সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়।

  3. অগ্রাধিকারযুক্ত পরিবার (PHH) কার্ড: এই কার্ডধারীরাও মাথাপিছু ৩ কেজি চাল ও ১ কেজি ৯০০ গ্রাম আটা বা ২ কেজি গম বিনামূল্যে পান।

  4. RKSY I কার্ড: এই কার্ডের মাধ্যমে উপভোক্তারা শুধুমাত্র মাথাপিছু ৫ কেজি চাল পান।

  5. RKSY II কার্ড: এই কার্ডধারীরা মাথাপিছু ২ কেজি চাল পাওয়ার অধিকারী।

কী কী কারণে বাতিল হতে পারে রেশন কার্ড?

সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট মাপকাঠির ভিত্তিতে অযোগ্য ব্যক্তিদের রেশন কার্ড বাতিল করা হচ্ছে:

  • শহরাঞ্চল বা আরবান এলাকার জন্য: যে সমস্ত পরিবারের তিন বা ততোধিক পাকা ঘর রয়েছে, বাড়িতে চার চাকা গাড়ি, এসি মেশিন, ইন্টারনেট যুক্ত কম্পিউটার বা ল্যাপটপ, রেফ্রিজারেটর, ল্যান্ডলাইন ফোন, ওয়াশিং মেশিন বা টু-হুইলার রয়েছে; কিংবা বাড়ির কোনো সদস্য যদি ইনকাম ট্যাক্স, প্রফেশনাল ট্যাক্স প্রদানকারী কিংবা রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের গেজেটেড বা পোষিত অফিসের কর্মচারী হন, তবে তাদের কার্ড বাতিলযোগ্য।

  • গ্রামীণ এলাকার জন্য: পরিবারে টু/থ্রি/ফোর হুইলার বা ফিশিং বোট থাকলে, ট্রাক্টর বা কৃষিকাজের ভারী মেশিন থাকলে, ৫০ হাজার বা তার বেশি লিমিটের কিষাণ ক্রেডিট কার্ড থাকলে, সরকারি রেজিস্টার্ড ব্যবসা ছাড়া অন্য উদ্যোগ থাকলে, পরিবারের কোনো সদস্যের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার বেশি হলে, ইনকাম ট্যাক্স দিলে, তিন বা তার বেশি পাকা ঘর থাকলে, কিংবা সেচের মেশিনসহ আড়াই একর বা তার বেশি সেচযুক্ত জমি এবং দুই-তিন ফসলি পাঁচ একর বা তার বেশি জমি থাকলে সেই রেশন কার্ড বাতিল করা হবে।

চালু হচ্ছে ‘স্মার্ট রেশন’ ব্যবস্থা

রেশন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা শতভাগ নিশ্চিত করতে রাজ্যে খুব শীঘ্রই সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও আধুনিক ‘স্মার্ট রেশন’ ব্যবস্থা চালু হতে চলেছে। এর অধীনে ডিস্ট্রিবিউটরের গুদাম থেকে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ, রেশন দোকানে গ্রাহকদের তা বন্টন এবং কার্ড পরিচালনা— পুরোটাই হবে অনলাইনে। কেন্দ্রীয় সরকারের যৌথ উদ্যোগে এই ব্যবস্থায় রেশন দোকানে গিয়ে খাদ্যসামগ্রী তোলার সময় চোখের মণি (Iris Scan) বা হাতের ছাপ (Biometric Verification) দেওয়া বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা কারচুপির আর কোনো সুযোগ থাকবে না বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *