শিক্ষামন্ত্রকের সচিবকে সরানো হল, নিট পেপার লিক কাণ্ডে নড়েচড়ে বসল সরকার

দেশজুড়ে নিট (NEET) পেপার লিক ও পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে যখন পড়ুয়ারা বিক্ষোভে উত্তাল, ঠিক সেই সময়েই বড় ধরনের প্রশাসনিক রদবদল করল কেন্দ্র। শিক্ষা মন্ত্রকের উচ্চশিক্ষা সচিব পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল বিনীত যোশীকে। তবে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়নি, বরং শিক্ষা মন্ত্রক থেকে সরিয়ে তাঁর নতুন পোস্টিং হয়েছে পঞ্চায়েতিরাজ মন্ত্রকে।
বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির নিরিখে এই প্রশাসনিক পদক্ষেপের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। যন্তর মন্তরে ছাত্রছাত্রীদের লাগাতার বিক্ষোভ এবং বিরোধী দলগুলির ক্রমাগত চাপে কোণঠাসা কেন্দ্রীয় সরকার। এমন পরিস্থিতিতে এই রদবদল কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা।
বিনীত যোশীর অপসারণ কেন সাধারণ রদবদল নয়?
বিনীত যোশী অত্যন্ত অভিজ্ঞ এক আইএএস অফিসার (১৯৯২ ব্যাচ, আইআইটি কানপুর)। তিনি ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-র প্রথম মহাপরিচালক, সিবিএসই-র (CBSE) প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং উচ্চশিক্ষা সচিবের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব সামলেছেন। বর্তমান প্রশ্নবিদ্ধ পরীক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত শীর্ষ আধিকারিকদের মধ্যে তাঁকে অন্যতম বলে গণ্য করা হয়। সেই কারণে তাঁর এই অপসারণকে নিছক একটি রুটিন প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে দেখতে নারাজ রাজনৈতিক ও শিক্ষা মহলের একাংশ।
ছাত্র আন্দোলন ও মূল প্রশ্ন: কাঠামোগত সংস্কার চাই
সিজেপি (CJP)-র ব্যানারে আন্দোলনরত পড়ুয়া ও যুবসমাজ শুধু কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিই তুলছেন না, বরং তাঁরা দেশের গোটা শিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন। তাঁদের সাফ বক্তব্য, কেবল একজন মন্ত্রী বা শীর্ষ আধিকারিককে বদলি করলেই এই গভীর সমস্যার সমাধান হবে না; বরং গোটা পরীক্ষাপদ্ধতিকে আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা কি কেবল একজন নির্দিষ্ট আধিকারিকের ব্যর্থতার ফল? প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় স্তরের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় একাধিক স্তর জড়িত থাকে—যেমন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ, নিরাপদ পরিবহণ, পরীক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা, ডিজিটাল তথ্যের সুরক্ষা এবং স্থানীয় স্তরে নজরদারি। ফলে শুধুমাত্র শীর্ষ স্তরে মুখ বদল করলেই ব্যবস্থার ত্রুটি দূর হবে না।
কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন সচিব নরেশ পাল গাঙ্গোয়ার
বিনীত যোশীর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ১৯৯৪ ব্যাচের আইএএস অফিসার নরেশ পাল গাঙ্গোয়ার। তাঁকে নতুন উচ্চশিক্ষা সচিব হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। তবে এই দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সামনে একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে:
-
প্রশাসনিক কাজকর্ম দ্রুত স্বাভাবিক করা।
-
দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর পরীক্ষাব্যবস্থার প্রতি হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা।
প্রসঙ্গত, পরীক্ষা সংক্রান্ত বিতর্কের জেরে কেন্দ্রের প্রশাসনিক রদবদলের ঘটনা নতুন নয়। এর আগে সিবিএসই-র পরীক্ষার ফলাফল ও পদ্ধতি নিয়ে দেশজুড়ে ছাত্র-অভিভাবকদের বিক্ষোভের পর সরকার দ্রুত পদক্ষেপ করে সিবিএসই-র শীর্ষ আধিকারিকদের বদলে নতুন মুখ নিয়ে এসেছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— এই সংস্কার কি শুধুই মুখ বদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি পরীক্ষা ব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটবে? বিগত কয়েক বছরে একের পর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি এক গভীর কাঠামোগত সংকট।