মেট্রো শহরের দিন কি শেষ? দেশের নতুন কর্মসংস্থানের হাব হয়ে উঠছে কোন কোন ছোট শহর?

মুম্বই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা চেন্নাইয়ের মতো মেট্রো শহরগুলি এক সময় দেশের চাকরিপ্রার্থীদের প্রধান গন্তব্য হলেও, সেই চেনা মানচিত্র ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। পেশাদার নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম লিঙ্কডইন (LinkedIn)-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষায় ঠিক এমনই এক বড় বদলের ইঙ্গিত মিলেছে। সংস্থার প্রকাশিত ‘সিটিজ় অন দ্য রাইজ়’ (Cities on the Rise) তালিকার দ্বিতীয় সংস্করণের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের নতুন কর্মসংস্থানের কেন্দ্র বা হাব হিসেবে দ্রুত উঠে আসছে বিশাখাপত্তনম, লুধিয়ানা, সুরাট, ভদোদরা এবং প্রয়াগরাজের মতো উদীয়মান শহরগুলি। শিল্প, প্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা এবং পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলেই এই শহরগুলিতে চাকরির বাজার দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে।

চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা ও এআই-এর প্রভাব

লিঙ্কডইন-এর ওই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, ২০২২ সালের শুরু থেকে প্রতিটি শূন্যপদের জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা বিগত কয়েক বছরে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে পূর্বের তুলনায় বর্তমান সময়ে চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতা অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।

সমীক্ষা অনুসারে, চলতি বছরে ভারতের প্রায় ৭২ শতাংশ পেশাদার নতুন চাকরির সন্ধান করছেন। তবে তাঁদের মধ্যে ৭৬ শতাংশের মত, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক দক্ষতার ঘাটতির (Skill Gap) কারণে চাকরি পাওয়া এখন আগের চেয়ে অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং। এই কঠিন পরিস্থিতিতে দেশের উদীয়মান টিয়ার-২ এবং টিয়ার-৩ শহরগুলি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। এখন তরুণ-তরুণীরা তাঁদের নিজের শহর বা তার কাছাকাছি এলাকাতেই বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্র, নতুন স্টার্টআপ এবং কারখানায় কাজের সুযোগ খুঁজে পাচ্ছেন।

লিঙ্কডইন-এর কেরিয়ার বিশেষজ্ঞ নীরাজিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশ এখন আর কেবল কয়েকটি মাত্র মেট্রো শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন কর্মসংস্থানের বাজার গড়ে উঠছে, যেখানে চিরাচরিত শিল্পের পাশাপাশি প্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা ও পরিকাঠামো দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। চাকরিপ্রার্থীদের তাই কেরিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে শহর নির্বাচনের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত।

কোন শহর কোন ক্ষেত্রে এগিয়ে?

লিঙ্কডইন-এর রিপোর্টে দেশের বিভিন্ন উদীয়মান শহরগুলির উন্নতির ক্ষেত্রগুলিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে:

  • বিশাখাপত্তনম: বন্দর, ওষুধ শিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের পাশাপাশি এই শহরে বর্তমানে এআই, ডেটা সেন্টার এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগ আসছে।

  • লুধিয়ানা: ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের পাশাপাশি এখানে ইস্পাত, বিমান পরিষেবা এবং আতিথেয়তা (Hospitality) শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।

  • সুরাট: শুধুমাত্র ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র ও হিরে শিল্পের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে সুরাট এখন স্টার্টআপ, রপ্তানি এবং রিয়েল এস্টেট ক্ষেত্রেও দারুণ উন্নতি করছে।

  • ভদোদরা: রাসায়নিক ও যন্ত্র নির্মাণ শিল্পের পাশাপাশি প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কর্পোরেট বিনিয়োগ এই শহরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

  • বিজয়ওয়াড়া: তথ্যপ্রযুক্তি ও ই-গভর্ন্যান্স সংস্থাগুলির আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতি এক নতুন গতি পেয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ১০টি শহরের প্রতিটিতেই তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা এবং প্রযুক্তি পরামর্শদাতা (Tech Consulting) সংস্থাগুলি নিয়োগের নিরিখে প্রথম তিনটি প্রধান ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি, ৮টি শহরে ব্যাঙ্কিং ও আর্থিক পরিষেবা অন্যতম প্রধান নিয়োগকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্মসংস্থানের এই ভৌগোলিক বিস্তার দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। এর ফলে একদিকে যেমন বড় শহরগুলির ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমবে, তেমনই ছোট ও মাঝারি শহরগুলিতেও শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি আরও মজবুত হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *