“ওটা আর আমার জায়গা নয়!” কোন চরম কৃত্রিমতার প্রতিবাদে জনপ্রিয় গানের শো থেকে চিরতরে সরে দাঁড়ালেন গায়িকা?

ছোটপর্দার দুনিয়ায় একের পর এক গানের রিয়েলিটি শো আসার অন্ত নেই। জাজদের প্রশংসা, আবেগঘন মুহূর্ত আর হাই-ভোল্টেজ পারফরম্যান্স দেখতে অভ্যস্ত দর্শককুল। অথচ একটা সময়ে ছোটপর্দার জনপ্রিয় সব রিয়েলিটি শো-এর প্রথম সারির বিচারক আসনে নিয়মিত দেখা গেলেও, বহুদিন ধরেই সেই মঞ্চ থেকে সম্পূর্ণ উধাও বলিউডের অন্যতম সেরা তথা জনপ্রিয় গায়িকা সুনিধি চৌহান (Sunidhi Chauhan)। বিতর্ক থেকে সর্বদা দূরত্ব বজায় রাখা সুনিধি ঠিক কী কারণে গানের রিয়েলিটি শো বিচার করা পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেন, তা নিয়ে অনুরাগীদের মনে কৌতূহলের অন্ত ছিল না। অবশেষে এই গোটা বিতর্ক নিয়ে রাখঢাক না রেখে একেবারে স্পষ্ট ও বিস্ফোরক জবাব দিলেন তারকা গায়িকা নিজেই।

সম্প্রতি প্রবীণ অভিনেতা শেখর সুমনের জনপ্রিয় টক শো ‘শেখর টুনাইট’-এ বিশেষ অতিথি হিসেবে হাজির হয়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন গায়িকা। আড্ডার একেবারে মেজাজেই শেখর সুমন সুনিধির কাছে সোজাসাপ্টা জানতে চান, একসময়ে রিয়েলিটি শোর নিয়মিত মুখ হয়েও ঠিক কোন কারণে তিনি আচমকা এজাতীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে এক্কেবারে দূরত্ব তৈরি করে নিলেন? কোনো রকম রাখঢাক না করে একেবারে সোজা ব্যাটে উত্তর দেন সুনিধি। তাঁর স্পষ্ট কথা, “অনেক বছর তো বিচারক হিসেবে কাজ করলাম। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর আমার মনে হলো, ওই জায়গাটা আর আমার জন্য নয়!”

ঠিক কী কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন গায়িকা?
মনের ভিতর চলা এই ভাবনা বদলের মূল কারণটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুনিধি সোজাসাপ্টা আঙুল তোলেন আধুনিক গান তৈরির বিভিন্ন প্রযুক্তির দিকে। গায়িকার পরিষ্কার মত, ইদানীং সাউন্ড স্টুডিও এবং রিয়েলিটি শোর লাইভ পারফরম্যান্সের মধ্যকার সুক্ষ্ম তফাতটাই যেন ক্রমশ মুছে যেতে বসেছে। অতীতে কোনো গানে বিশেষ টুইস্ট বা সাউন্ড এফেক্ট যোগ করতে স্টুডিওর অন্দরে অটো-টিউন (Auto-tune) কিংবা মেলোডাইন-এর (Melodyne) মতো কৃত্রিম প্রযুক্তির ব্যবহার চলত। কিন্তু আসল সমস্যা শুরু হয়েছে অন্য জায়গায়। যে রিয়েলিটি শোর মূল শর্তই হওয়ার কথা শিল্পীর আসল গলা ও গানের সততা, সেই পবিত্র মঞ্চেও নাকি এখন নিঃশব্দে থাবা বসিয়েছে এই অটো-টিউন প্রযুক্তি।

গভীর আক্ষেপের সুরে সুনিধি জানান, রিয়েলিটি শোর মঞ্চে গানকে একেবারে ‘পারফেক্ট’ শোনানোর খাতিরে যখন এই ধরনের কৃত্রিম প্রযুক্তির অপব্যবহার শুরু হলো, তখনই তাঁর মনে মারাত্মক খটকা লাগে। গায়িকার মোক্ষম ভাষা অনুযায়ী, “বিষয়টা যখন সম্পূর্ণ সেই দিকে মোড় নিল, তখন আমার স্পষ্ট মনে হলো যে আসল সুরটা অন্য কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। এই কৃত্রিমতার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই নিজেকে মেলাতে পারছিলাম না। তাই সেখান থেকে চিরতরে সরে আসা ছাড়া আমার আর কোনো দ্বিতীয় পথ খোলা ছিল না।”

কথোপকথনের মাঝেই সঞ্চালক লাইভ কনসার্টে বহু শিল্পীর সঙ্গে ঘটে চলা বিভিন্ন অনভিপ্রেত ও অপ্রীতিকর ঘটনার প্রসঙ্গও টেনে আনেন। কেকে (KK) কিংবা সোনু নিগম (Sonu Nigam)-এর মতো দেশের তাবড় শিল্পীদের অতীতের একাধিক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি জানতে চান, সুনিধিকে কখনো স্টেজে দাঁড়িয়ে এমন কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়তে হয়েছে কি না। জবাবে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সুনিধি জানান, এই নির্দিষ্ট দিক থেকে তিনি নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবতী বলেই মনে করেন। আজ পর্যন্ত শ্রোতারা তাঁকে কেবল অফুরন্ত ভালোবাসা ও সমর্থনই দেননি, বরং মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি সবসময় সবার সমান সম্মান ও শ্রদ্ধাও অর্জন করেছেন। টিআরপি বা অন্ধ প্রচারের ইঁদুরদৌড়ের বদলে নিজের গানের প্রতি খাঁটি সততা বজায় রাখাই যে আজও তাঁর কাছে সর্বেসর্বা, তাঁর এই আপসহীন সিদ্ধান্তেই তা আরও একবার স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *