“আগুন ধরিয়ে দিল ওরা”-বাংলাদেশের এই প্রাচীন রথ উচ্চতায় পুরীর চেয়েও ছিল বড়

রথযাত্রা মানেই ভক্তদের চোখের সামনে পুরীর জগন্নাথ দেবের বিশাল রথ। তবে ইতিহাসে এমন একটি রথযাত্রার কথা রয়েছে, যা উচ্চতায় ও বিশালতায় পুরীর রথকেও হার মানাত— সেটি হলো বাংলাদেশের ধামরাইয়ের রথযাত্রা। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের পাক বাহিনীর ধ্বংসলীলা এই ঐতিহ্যের গায়ে এঁকে দিয়েছে এক গভীর ক্ষত।

ইতিহাসের সাক্ষী ধামরাই ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে ধামরাইয়ে অবস্থিত ৫০০ বছরের প্রাচীন যশোমাধব মন্দির। ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে শুরু হওয়া এই রথযাত্রা একসময় অবিভক্ত বাংলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল। ২৭ ফুট চওড়া ও ৬০ ফুট উঁচু ১৫ চাকাযুক্ত এই রথ টানা হতো ১০০০ কেজি ওজনের দড়ি দিয়ে। পুরীর রথ ৪৪ ফুট উঁচু হলেও ধামরাইয়ের রথ ছিল আরও বিশাল।

দেশভাগ ও রণদাপ্রসাদ সাহার অবদান ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর জমিদার প্রথা বিলুপ্ত হলে ধামরাইয়ের রথযাত্রার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সেই দুর্দিনে ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসেন বিখ্যাত শিল্পপতি রায় বাহাদুর রণদাপ্রসাদ সাহা। তাঁর হাত ধরেই ধামরাইয়ের রথযাত্রা নতুন প্রাণ পায়।

১৯৭১: এক কালো অধ্যায় ১৯৭১ সালের অপারেশন সার্চলাইটের ভয়াবহতায় তছনছ হয়ে যায় ধামরাইয়ের ঐতিহ্য। পাকিস্তান সেনার নৃশংসতার শিকার হন রণদাপ্রসাদ সাহা ও তাঁর পুত্র ভবানীপ্রসাদ সাহা। তাঁদের অপহরণ করে হত্যা করা হয় বলে ধারণা করা হয়। সেই সঙ্গে ১০ জুন, ১৯৭১ সালে পাক সেনারা আগুন ধরিয়ে দেয় ৫০০ বছরের প্রাচীন সেই বিশাল রথে। মুহূর্তের মধ্যে ইতিহাসের সাক্ষী সেই রথ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

পুনর্জন্ম ও বর্তমান পরিস্থিতি স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ফের রথযাত্রা শুরু হলেও ধামরাইয়ের সেই পুরনো জৌলুস আর ফিরে আসেনি। তবে ভারতের সহায়তায় ২০১০ সালে নতুন করে ৪০ ফুট উঁচু ১৬ চাকার রথ তৈরি করা হয়। আজও সেখানে আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা পালিত হয় ঠিকই, কিন্তু ধামরাইয়ের সেই সুবিশাল প্রাচীন রথ পুড়িয়ে দেওয়ার মর্মান্তিক স্মৃতি আজও ভক্তদের হৃদয়ে গভীর বেদনা বয়ে আনে।

আজকের এই রথযাত্রার মরসুমে, ধামরাইয়ের সেই হারিয়ে যাওয়া গৌরব ও লড়াইয়ের ইতিহাস যেন মনে করিয়ে দেয়— ঐতিহ্যের চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *