গ্বাদারে ভয়াবহ হামলা! কোস্ট গার্ড ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিল বিএলএ, বাড়ছে যুদ্ধের দামামা!

চীনের অর্থায়নে তৈরি ৬২ বিলিয়ন ডলারের ‘চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর’ (CPEC)-এর কেন্দ্রবিন্দু গ্বাদারে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ফের বড়সড় প্রশ্নের মুখে। গত শুক্রবার জিউয়ানির পানওয়ান এলাকায় পাকিস্তান কোস্ট গার্ডের একটি ক্যাম্পে ভয়াবহ আত্মঘাতী ট্রাক বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (BLA)-এর ‘ফাতেহ স্কোয়াড’ এই হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করেছে যে, বিস্ফোরণে ক্যাম্পটি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে এবং তাদের হামলায় ৩০ জনেরও বেশি নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। যদিও পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেনি, তবে এই ঘটনাটি সিপিসি (CPEC)-এর নিরাপত্তার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিএলএ-এর নতুন কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক মাসে বিএলএ গ্বাদার পোর্ট অথরিটি কমপ্লেক্স এবং টারবাতের নৌ ঘাঁটির মতো সুরক্ষিত স্থানে হামলা চালিয়েছে। এ বছরই কোস্ট গার্ডের টহলরত বোট ডুবিয়ে তিন কর্মীকে হত্যার ঘটনা ছিল সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর প্রথম বড় আঘাত। এরপর থেকে বিএলএ তাদের নিজস্ব ‘নৌ শাখা’ এবং ড্রোন ইউনিটের মাধ্যমে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। স্থল, আকাশ এবং সমুদ্র—এই তিন দিক থেকেই বিএলএ-এর আক্রমণাত্মক অবস্থান পাকিস্তানকে এক ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। শুক্রবারের এই হামলা প্রমাণ করে যে, বিদ্রোহীরা এখন কেবল টহলরত বোট নয়, বরং সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটিকেও সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে গ্বাদার
গ্বাদারের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ এখন চরম হুমকির মুখে। বিমা সংস্থাগুলো ঝুঁকি নিরুপণে অত্যন্ত কঠোর। যখনই কোনো বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন বড় ঘাটতি দেখা দেয়, তখন বিমা প্রিমিয়াম হু হু করে বাড়তে থাকে। শিপিং কোম্পানিগুলো স্বভাবতই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলে। নিরাপত্তা সংকটের কারণে গ্বাদার যদি একটি ‘লাইভ থ্রেট জোন’ বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়, তবে এর বাণিজ্যিক উপযোগিতা কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। সিপিসি-র আওতায় ৯০টি প্রকল্পের মধ্যে ২০২৬ সাল নাগাদ মাত্র ৩৮টি শেষ হয়েছে, যার ফলে বন্দরের অর্থনৈতিক সাফল্যের সম্ভাবনা এমনিতেই ম্লান ছিল। নিরাপত্তা সংকট সেই সম্ভাবনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
মিলিটারাইজেশন বনাম স্থানীয় অসন্তোষ
বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—এই করিডোরটি স্থানীয় জনগণের কোনো উপকারে আসছে না, বরং প্রদেশের সম্পদ চীনের হাতে তুলে দেওয়ার একটি উপায় মাত্র। চীন ও চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সরকার সেখানে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ডিভিশন’ মোতায়েন করেছে। কিন্তু এই সামরিকীকরণ সাধারণ বালুচ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা পরোক্ষভাবে বিএলএ-এর সদস্য সংখ্যা ও শক্তির যোগান দিচ্ছে। নিরাপত্তা বাড়ালেই বিদ্রোহের তীব্রতা কমছে না, বরং এই চক্রটি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
পর্যবেক্ষণ
পাকিস্তানের জন্য গ্বাদার কেবল একটি বন্দর নয়, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বপ্ন। কিন্তু যে বন্দর নিজের কোস্ট গার্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, সেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—তা এখন বিশ্বজুড়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।