ইলন মাস্কের স্বপ্নভঙ্গ, অস্তিত্বসঙ্কটে ভুগছে ‘রোবোট্যাক্সি’, জেনেনিন কেন?

চালকহীন গাড়ির দুনিয়ায় বিপ্লব আনার যে বড় স্বপ্ন ইলন মাস্ক দেখিয়েছিলেন, তা এখন চরম বাস্তবতার মুখে। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলার দাবি নিয়ে বাজারে আসা টেসলার ‘রোবোট্যাক্সি’ বা স্বয়ংক্রিয় গাড়ি পরিষেবা এখন তীব্র সংকটে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, আমেরিকার প্রধান শহরগুলোতে এই পরিষেবার পরিধি নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
মাত্র এক মাসের ব্যবধানে টেক্সাসের অস্টিন, ডালাস ও হিউস্টনের মতো শহরগুলোতে ১৬৫টি রোবোট্যাক্সি কমে এখন সাকুল্যে দাঁড়িয়েছে ৩৪টিতে। আরও বড় ধস নেমেছে ক্যালিফোর্নিয়ায়; যেখানে আগে ১০৭টি গাড়ি চলত, সেখানে এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে মাত্র ৯টি টেসলা রোবোট্যাক্সি।
কেন ব্যর্থতার মুখে মাস্কের চালকহীন ট্যাক্সি?
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিবিদদের মতে, মূলত বেশ কিছু গুরুতর ত্রুটি ও বিতর্কের কারণেই মুখ থুবড়ে পড়ছে টেসলার এই স্বপ্নের প্রকল্প:
-
দুর্ঘটনার উচ্চ হার ও নিরাপত্তা ঝুঁকি: মার্কিন সড়ক ট্র্যাফিক নিরাপত্তা বিভাগের (NHTSA) তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ চালকের দ্বারা চালিত গাড়ির তুলনায় টেসলার এই রোবোট্যাক্সিগুলো চারগুণ বেশি দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে, যা সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
-
এআই (AI) ট্রেইনারদের অনীহা: এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার পেছনে কর্মরত ৯ জন এআই ট্রেনারের মধ্যে ৭ জনই এর নিরাপত্তা নিয়ে সরাসরি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, টেসলার ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ (FSD) মোডটি অ্যাম্বুলেন্স বা মোটরবাইকের মতো জরুরি বাহন সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারছে না। এমনকি জটিল মোড় বা ট্র্যাফিক সিগন্যালেও গাড়িগুলো মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
-
মিথ্যা প্রচারের বিতর্ক: টেসলা দাবি করেছিল যে তাদের এই প্রযুক্তি মানুষের চেয়ে ১০ গুণ বেশি নিরাপদ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোম্পানিটি সুরক্ষার আসল পরিসংখ্যানকে প্রায় ৩০০ শতাংশ বাড়িয়ে মিথ্যা প্রচার করেছে।
-
ম্যাপহীন প্রযুক্তির অসারতা: কোনো মানচিত্র ছাড়া কেবল ক্যামেরার ওপর ভর করে গাড়ি চালানোর যে তত্ত্ব ইলন মাস্ক দিয়েছিলেন, বাস্তবে তা ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। এআই ট্রেইনারদের তৈরি নির্দিষ্ট ম্যাপ ছাড়া এই গাড়িগুলো পুরোপুরি অচল।
-
সফটওয়্যার জটিলতা ও গ্রাহকদের অসন্তোষ: ইলন মাস্ক নিজেই জানিয়েছেন, উন্নত সংস্করণের ‘এফএসডি-১৫’ বাজারে না আসা পর্যন্ত গাড়ির সংখ্যা আর বাড়ানো হবে না। এর ওপর অ্যাপের দুর্বলতা এবং গাড়ির জন্য আধঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করার ঝামেলার কারণে যাত্রীরা এই পরিষেবা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
-
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা: চরম আবহাওয়ায় টেসলার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইউরোপের দেশগুলো। নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ও নরওয়ের মতো দেশ স্পষ্ট জানিয়েছে, বরফে ঢাকা রাস্তায় এই গাড়ি চালানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ফায়দা তুলছে প্রতিদ্বন্দ্বী ‘ওয়াইমো’
টেসলার এই স্থবিরতার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা ‘ওয়াইমো’ (Waymo)। বর্তমানে আমেরিকার বুকে তাদের প্রায় ৩,০০০ রোবোট্যাক্সি সফলভাবে চলাচল করছে এবং তারা বাজারে দ্রুত আধিপত্য বিস্তার করছে। সব মিলিয়ে, টেসলার স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা এখন এতটাই তলানিতে যে, অনেক যাত্রী বিনামূল্যেও এই রোবোট্যাক্সিতে চড়তে দ্বিধাবোধ করছেন।