ভারতীয় মাখানার জয়জয়কার! মার্কিন মুলুকে হু হু করে বাড়ছে চাহিদা, বিহারের এই ফসলই কি এখন গেম চেঞ্জার?

একসময় যা কেবল পূজা-পার্বণ বা উপবাসের উপাচার ছিল, আজ তা বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের প্রথম পছন্দ। প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়ামের খনি হিসেবে পরিচিত ‘মাখানা’ এখন ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বিশ্বমঞ্চে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় মাখানার চাহিদা তুঙ্গে। কেন এই সুপারফুডের প্রেমে মজেছে আমেরিকা? আর কীভাবে বিহারের পুকুর থেকে উঠে আসা এই ফসল বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের নতুন শক্তি হয়ে উঠছে?

আমেরিকা কেন মাখানার সবচেয়ে বড় ক্রেতা?
বিশ্ববাজারে মাখানার ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখে ভারত সরকার সম্প্রতি ‘মাখানা বোর্ড’ গঠন করেছে। মূলত পাঁচটি কারণে মার্কিন বাজারে এটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী:

স্বাস্থ্য ও সুপারফুড ট্রেন্ড: কম-ক্যালোরিযুক্ত এবং পুষ্টিকর স্ন্যাকসের সন্ধানে থাকা আমেরিকানদের কাছে রোস্টেড মাখানা এখন সেরা বিকল্প।

গ্লুটেন-মুক্ত ও উদ্ভিদ-ভিত্তিক ডায়েট: আমেরিকায় গ্লুটেন-মুক্ত খাবার ও ভেষজ খাদ্যাভ্যাসের হিড়িক পড়েছে, যার সঙ্গে মাখানার গুণাবলি হুবহু মিলে যায়।

ভারতীয় প্রবাসীদের টান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল সংখ্যক ভারতীয় ও দক্ষিণ এশীয়দের উপস্থিতিও এই পণ্যটির নিয়মিত চাহিদা বজায় রাখতে সাহায্য করছে।

জলখাবার সংস্কৃতি: সহজে বহনযোগ্য এবং বিভিন্ন ফ্লেভারে পাওয়া যায় বলে এটি আমেরিকার ‘অন-দ্য-গো’ স্ন্যাকস কালচারে অনায়াসেই জায়গা করে নিয়েছে।

উন্নত প্যাকেজিং ও রপ্তানি: ভারতীয় মাখানার আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ এবং ব্র্যান্ডেড মশলাদার ফ্লেভারের সংযোজন এটিকে প্রিমিয়াম বাজারে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করেছে।

বিহার: মাখানা চাষের বিশ্বরাজধানী
বিশ্বের মোট মাখানা উৎপাদনের সিংহভাগই আসে ভারতের বিহার থেকে, বিশেষ করে মিথিলা অঞ্চল থেকে। বিহার কেন এই চাষের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল?

১. প্রাকৃতিক অনুকূল পরিবেশ: মিথিলা অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও পুকুর মাখানা চাষের জন্য আদর্শ।
২. প্রজন্মের দক্ষতা: মাখানা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো শ্রমসাধ্য কাজ বিহারের মানুষ বংশপরম্পরায় করে আসছে।
৩. জিআই (GI) ট্যাগের স্বীকৃতি: বিহারের মাখানা ‘জিআই ট্যাগ’ পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর বিশ্বাসযোগ্যতা ও চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে।
৪. আধুনিকায়ন: পুকুর ছাড়িয়ে এখন কৃত্রিম জলাশয় বা জমিতে বাঁধ দিয়ে চাষের পরিধি বাড়ানো হয়েছে, যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।

উৎপাদন ও বাণিজ্যের চিত্র
ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১,২০,০০০ মেট্রিক টন মাখানা বীজ উৎপাদিত হয়, যা থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর প্রায় ৫৮,০০০ থেকে ৬৫,০০০ মেট্রিক টন ভোজ্য মাখানা পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই আসে বিহার থেকে। এছাড়া ঝাড়খণ্ড, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামেও এর চাষ হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশ—যারা ভারতের থেকে সবচেয়ে বেশি মাখানা আমদানি করে—তারা মোট রপ্তানির ৬০ শতাংশ অংশীদার।

স্বাস্থ্য সচেতনতা আর আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে বিহারের এই ঐতিহ্যবাহী ফসল আজ ভারতের অর্থনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হয়েছে।