অফিস ডেকে বলা হলো ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’,৮০০০ কর্মীকে তাড়িয়ে এ কী করল মেটা?

সকালে অফিসে যাওয়ার পর কর্মীদের বলা হলো, আজ থেকে আপনারা বাড়ি বসেই কাজ (Work From Home) করুন, অফিসে আসার দরকার নেই। হাঁফ ছেড়ে বাঁচা কর্মীরাও নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরে গেলেন। কিন্তু সেই রাতের অন্ধকার কাটার আগেই তাঁদের জীবনে নেমে এলো এক চরম বিপর্যয়। ভোররাতে ই-মেইলের একটি নোটিফিকেশনেই ওলটপালট হয়ে গেল হাজার হাজার মানুষের জীবন। মেইলে লেখা— “আপনার চাকরিটি আর নেই!”

প্রযুক্তি জগতের অন্যতম প্রভাবশালী মার্কিন টেক জায়ান্ট ‘মেটা’ (Meta)-র দপ্তরে সম্প্রতি এমনই এক হাড়হিম করা ঘটনা ঘটেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠানটি হঠাৎ করেই একযোগে হাজার হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করে বিশ্বজুড়ে নতুন করে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এক ধাক্কায় ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই!

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেটার মোট কর্মী সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৮ হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যে এক ধাক্কায় প্রায় ৮ হাজার কর্মীকে একযোগে ছাঁটাইয়ের ই-মেইল পাঠানো হয়েছে, যা তাদের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ১০ শতাংশ।

ভোর ৪টের ভয়ঙ্কর মেইল: সবচেয়ে নির্মম বিষয় হলো, এই ছাঁটাই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনে ও নাটকীয়ভাবে চালানো হয়েছে। স্থানীয় সময় ভোর চারটের দিকে হঠাৎ করেই কর্মীদের ইনবক্সে ছাঁটাইয়ের ই-মেইল পৌঁছায়। জানা গেছে, সিঙ্গাপুরের আঞ্চলিক দপ্তর থেকে এই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করা হয়েছে। বহু কর্মী সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ রগড়াতে রগড়াতে জানতে পারেন যে তাঁরা বেকার হয়ে গেছেন!

পদ বাতিল বনাম এআই (AI)-তে স্থানান্তর

বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি নিজেদের কাঠামোতে এক বড়সড় রদবদল এনেছে মেটা। সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে:

  • প্রায় ৬,০০০ পদ চিরতরে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।

  • কোম্পানির অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে প্রায় ৭,০০০ কর্মীকে নতুন করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই-কেন্দ্রিক’ (AI-Focused) বিভাগে স্থানান্তর করা হচ্ছে।

মেটার দাবি, তারা এখন আরও ছোট ও দক্ষ টিম গঠনের দিকে এগোচ্ছে, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজের গতি আরও বাড়ানো যায়। ছোট দলগুলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বেশি মনোযোগ দিতে পারে। তবে এই কর্পোরেট বার্তার আড়ালে আসল সত্য অন্য কিছু বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নেপথ্যে কি এআই-এর আগ্রাসন?

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, মেটা দীর্ঘদিন ধরেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-র পেছনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। মেটা এই বছরেই প্রায় ১২৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের মেগা পরিকল্পনা করেছে, যার সিংহভাগই খরচ হবে এআই উন্নয়ন ও ডাটা ইনফ্রাস্ট্রাকচারের পেছনে। এই বিপুল খরচের জোগান দিতে এবং ব্যবসাকে সম্পূর্ণভাবে এআই-কেন্দ্রিক করে তুলতেই এই গণ-ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।

সামনে কি আরও বড় বিপদ?

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, মেটার এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া এখানেই থেমে থাকবে না, বরং তা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হতে পারে। এবারের কোপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোম্পানির মূল চালিকাশক্তি ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ এবং ‘প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট’ টিম। ফলে বছরের শেষ নাগাদ আরও কয়েক হাজার কর্মীর ঘাড়ের ওপর ছাঁটাইয়ের খাঁড়া ঝুলছে, যা সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে গোটা বিশ্বের প্রযুক্তি মহলে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।