“আর রোগী ফেরানো যাবে না…”-পিজি হাসপাতালে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্যের ‘হাল’ ফেরাতে শুভেন্দুর ১০ দাওয়াই

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেহাল দশা, রোগী রেফার করার চেনা রোগ, বেড না পাওয়া আর দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বহুদিনের। এবার সেই ক্ষোভ মেটাতে এবং রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ভোল বদলে দিতে সরাসরি ময়দানে নামলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, হাসপাতালে আর কোনো দালালচক্র বরদাস্ত করা হবে না। কোনো রোগীকে ফেরানোও যাবে না, প্রয়োজনে বাড়াতে হবে বেডের সংখ্যা। কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলির শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে এক হাইপ্রোফাইল বৈঠকে ঠিক এই ভাষাতেই কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার বিকেলে কলকাতার পিজি (SSKM) হাসপাতালে এই জরুরি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ১২টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ (Principal) এবং মেডিক্যাল সুপাররা (MSVP) উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য দফতরের শীর্ষ আধিকারিক ও স্বাস্থ্য অধিকর্তারাও এই বৈঠকে অংশ নেন। বিশেষ বিষয় হলো, প্রশাসনিক কর্তাদের পাশাপাশি এই বৈঠকে হাজির ছিলেন বিজেপির দুই বিধায়ক তথা পেশায় চিকিৎসক— ডক্টর ইন্দ্রনীল খাঁ এবং ডক্টর শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। আর এই বৈঠকেই হাসপাতালের ‘রোগ’ সারাতে একাধিক কড়া দাওয়াই দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ মুখ্যমন্ত্রীর
সূত্রের খবর, রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রোগী ভোগান্তি, বেড না পেয়ে হয়রানি এবং দালালদের উৎপাত নিয়ে যে সমস্ত অভিযোগ প্রতিনিয়ত ওঠে, সেগুলি ধরে ধরে কড়া বার্তা দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন, হাসপাতালে দালালদের কোনো জায়গা নেই। এই ধরনের কোনো চক্র সক্রিয় থাকার সামান্যতম অভিযোগ পেলেই পুলিশ ও প্রশাসনকে দ্রুত এবং কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে রোগীদের ‘রিফিউজাল’ বা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। কোনো অবস্থাতেই যাতে মুমূর্ষু রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া না হয়, তার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে হাসপাতালের বেড সংখ্যা বাড়ানোর কথাও বলেছেন তিনি, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো যায়।
স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড ও আইডি কার্ড
হাসপাতালের ভেতরে বেড বুকিং নিয়ে চলা কালোবাজারি রুখতে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এবার থেকে প্রতিটি হাসপাতালে বড় ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড লাগানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই বোর্ডে রিয়েল টাইমে (ঠিক সেই মুহূর্তে) দেখাতে হবে কোন বিভাগে কতজন রোগী ভর্তি আছেন এবং কতগুলি বেড ফাঁকা রয়েছে। এর ফলে বেড লুকানোর চেনা কারচুপি বন্ধ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পাশাপাশি, হাসপাতালের শিক্ষক-চিকিৎসক, জুনিয়র ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের জন্য পরিচয়পত্র (ID Card) পরা বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। এর মূল উদ্দেশ্য হলো হাসপাতাল চত্বরে বহিরাগতদের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা। হাসপাতালের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে এবং সাধারণ মানুষ যাতে নির্ভয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন, তার জন্য পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মীদের কড়া নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কলকাতার সরকারি হাসপাতালগুলির অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বেশ করুণ। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে এই ধরনের কড়া ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। তবে মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া নির্দেশের পর বাস্তবে হাসপাতালগুলির ছবিটা কতটা বদলায়, এখন সেটাই দেখার।