এক চুমুকেই বাজিমাত! পেপসির এক ‘চ্যালেঞ্জে’ কীভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল কোকা-কোলা?

ব্যবসা জগতের ইতিহাসে সবথেকে বড় এবং রোমাঞ্চকর লড়াই যদি কিছু থাকে, তবে তা হলো কোকা-কোলা বনাম পেপসি। সত্তর ও আশির দশকে এই দুই সংস্থার আধিপত্যের লড়াই এমন এক মোড় নিয়েছিল, যা আজও মার্কেটিংয়ের পাঠ্যবইয়ে উদাহরণ হিসেবে পড়ানো হয়।

দ্য পেপসি চ্যালেঞ্জ: যখন কেঁপে উঠল কোকের সাম্রাজ্য

১৯৭৫ সাল। তখন বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য কোকা-কোলার। সেই সময় পেপসি শুরু করে ‘দ্য পেপসি চ্যালেঞ্জ’। পদ্ধতিটি ছিল খুব সাধারণ— লেবেলবিহীন দুটি কাপে কোক এবং পেপসি দেওয়া হতো সাধারণ মানুষকে। তাদের না জেনেই বলতে হতো কোনটির স্বাদ সেরা। অবিশ্বাস্যভাবে, অধিকাংশ মানুষ পেপসির স্বাদকেই বেছে নিয়েছিলেন। টিভিতে এই পরীক্ষার ফলাফল প্রচার হতেই কোকা-কোলা শিবিরে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

১৯৮৫: কোকা-কোলার সেই ‘ভয়ঙ্কর’ ভুল

পেপসির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেখে ঘাবড়ে গিয়ে কোকা-কোলা তাদের ৯৯ বছরের পুরনো আসল ফর্মুলা বন্ধ করে দেয়। ১৯৮৫ সালের ২৩শে এপ্রিল তারা বাজারে আনে ‘নিউ কোক’। এটি ছিল পেপসির মতোই বেশ মিষ্টি। কিন্তু স্বাদ বদলানোই ছিল তাদের সবথেকে বড় ভুল।

আমেরিকার রাস্তায় জনরোষ ও কান্নাকাটি

‘নিউ কোক’ বাজারে আসার পরেই শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ। মানুষ শুধু পানীয়ের রেসিপি পরিবর্তনকে মানতে পারেননি, কারণ কোকা-কোলা তখন আমেরিকানদের আবেগের অংশ হয়ে গিয়েছিল।

  • কোম্পানির কাছে জমা পড়ে ৪ লক্ষেরও বেশি প্রতিবাদপত্র।

  • টিভিতে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে মানুষকে কাঁদতে দেখা যায়।

  • পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মার্কিন সিনেটররা পর্যন্ত এই বিষয়ে ভাষণ দেন।

কোথায় ছিল আসল রহস্য?

পেপসি কেন ব্লাইন্ড টেস্টে জিতত? উত্তরটা ছিল মনোবিজ্ঞানে। পেপসি ছিল কোকের চেয়ে বেশি মিষ্টি। মানুষ যখন ‘এক চুমুক’ পান করত, তখন মিষ্টি স্বাদটাই বেশি ভালো লাগত। কিন্তু পুরো এক বোতল খাওয়ার ক্ষেত্রে কোকা-কোলার ফর্মুলাই ছিল বেশি আরামদায়ক। পেপসি জিতেছিল ‘স্বাদ পরীক্ষায়’, কিন্তু মানুষের ‘মনে’ রাজত্ব করছিল কোকা-কোলা।

হারিয়ে জেতার গল্প: ৭৭ দিনের প্রত্যাবর্তন

তীব্র জনরোষের মুখে পড়ে মাত্র ৭৭ দিনের মাথায় পরাজয় স্বীকার করে কোকা-কোলা। তারা তাদের পুরনো ফর্মুলা ‘কোকা-কোলা ক্লাসিক’ নামে পুনরায় বাজারে ফিরিয়ে আনে। মজার বিষয় হলো, এই প্রত্যাবর্তনের পর কোকা-কোলার বিক্রি ও জনপ্রিয়তা আগের চেয়েও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আজও অনেকে মনে করেন, এটি ছিল কোকা-কোলার একটি সূক্ষ্ম পরিকল্পিত চাল, যদিও কোম্পানিটি বরাবরই তা অস্বীকার করেছে।

উপসংহার: ব্যবসা মানে যে শুধু পণ্যের গুণমান নয়, বরং মানুষের আবেগের সাথে যুক্ত হওয়া— কোকা-কোলা ও পেপসির এই লড়াই তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।