চৈত্র শেষে লটারি লাগল কুমোর পাড়ায়! কোন জাদুতে এক মাসেই বছরভরের লক্ষ্মীলাভ মৃৎশিল্পীদের?

সারা বছর খুব একটা বিক্রিবাটা থাকে না। অবহেলা আর অভাবই যেন নিত্যসঙ্গী। কিন্তু বছরের শেষ মাসটা আসতেই নাওয়া-খাওয়া ভুলেছেন পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির মৃৎশিল্পীরা। নববর্ষের আবাহন শুরু হতেই কুমোর পাড়ায় এখন তুঙ্গে ব্যস্ততা। না, কোনো প্রতিমা নয়, এখন নাওয়া-খাওয়া ভুলে মাটির ‘ঝরা’ বা ছোট হাঁড়ি তৈরিতে মগ্ন শিল্পীরা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে চাকার ঘূর্ণি, আর চারপাশ ম ম করছে ভিজে মাটির গন্ধে।
ঐতিহ্যের টানেই ফিরছে সুদিন:
হিন্দুশাস্ত্রে বৈশাখ মাসে চড়া রোদে তুলসী গাছকে সতেজ রাখতে গাছের ওপর জলভর্তি মাটির হাঁড়ি বা ‘ঝরা’ বেঁধে রাখার রীতি রয়েছে। হাঁড়ির নিচে ছোট ছিদ্র দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল সারাদিন ধরে তুলসী গাছের গোড়ায় পড়ে, যা গাছকে ঠান্ডা ও সজীব রাখে। এই প্রাচীন প্রথার ওপর নির্ভর করেই বছরের এই সময়টায় কাঁথির মৃৎশিল্পীদের ঘরে লক্ষ্মীলাভ হয়। রাস্তার ধারে সারি সারি হাঁড়ি সাজিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বিক্রি। কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ চাকার সাহায্যে গড়ছেন নিখুঁত আকার, আবার কেউ রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করছেন সেই হাঁড়ি।
ব্যবসায়ীদের আগাম অর্ডার:
বাজারে যাতে কোনোভাবেই ঘাটতি না থাকে, সেদিকে কড়া নজর রাখছেন শিল্পীরা। কারণ, এই কয়েকদিনের উপার্জনের ওপরই নির্ভর করে তাঁদের সারা বছরের সংসার। স্থানীয় বিক্রেতা বিজয় বেরা জানান, “সারা বছর মাটির হাঁড়ির চাহিদা খুব একটা থাকে না। কিন্তু চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে চাহিদা প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়। প্রায় প্রতি বাড়িতেই এই হাঁড়ি কেনা হয়।” বড় ব্যবসায়ীরাও এখন থেকে পাইকারি দরে অর্ডার দিয়ে রাখছেন।
আশার আলো মৃৎশিল্পে:
বর্তমানে প্লাস্টিক ও আধুনিক সরঞ্জামের যুগে মৃৎশিল্পীরা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও, নববর্ষের এই মরসুম তাঁদের নতুন আশার আলো দেখায়। বছরের বাকি সময় মন্দা থাকলেও চৈত্র-বৈশাখের এই এক মাসের বিক্রিই তাঁদের মুখে হাসি ফোটায়। প্রখর রোদে যখন পারদ চড়ছে, ঠিক তখনই মাটির হাঁড়ির নিচে ছিদ্র করে জল ঢালার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাঙালি। আর সেই বাঙালির আবেগকে পুঁজি করেই নতুন করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাংলার প্রাচীন এই মৃৎশিল্প।