ভারতের ইতিহাসে নজিরবিহীন! মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরাতে সংসদে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব বিরোধীদের

ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে আজ এক অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হলো। এই প্রথম দেশের কোনও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের (CEC) বিরুদ্ধে সরাসরি অপসারণ বা ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব পেশ করল বিরোধী শিবির। শুক্রবার লোকসভা এবং রাজ্যসভার সচিবালয়ে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এই নোটিস জমা দিয়েছে ‘ইন্ডিয়া’ জোট। রাজনৈতিক মহলের মতে, মোদী সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আজ চরম রূপ নিল।
তৃণমূলের নেতৃত্বে মেগা জোট: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর এই লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলীয় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত কয়েক মাস ধরেই ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় কারচুপির অভিযোগে সরব ছিলেন। এমনকি জনসভা থেকে জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি তিনি। তাঁরই নির্দেশে তৃণমূলের সাংসদরা দিল্লি চষে বেড়িয়ে সমস্ত বিরোধী দলকে এক ছাতার তলায় এনে ১৯৩ জন সাংসদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে লোকসভার ১৩০ জন এবং রাজ্যসভার ৬৩ জন সাংসদ রয়েছেন।
৭টি গুরুতর অভিযোগ: সংসদে পেশ করা ওই নোটিসে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মূলত সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছে। বিরোধীদের দাবি:
-
নির্বাচন পরিচালনায় চরম পক্ষপাতদুষ্ট এবং বৈষম্যমূলক আচরণ।
-
নির্বাচনী জালিয়াতির তদন্তে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা প্রদান।
-
বিপুল সংখ্যক যোগ্য ভোটারকে পরিকল্পিতভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা।
-
বিজেপি-কে অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
অপসারণ কি আদৌ সম্ভব? ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং এটি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির অপসারণ প্রক্রিয়ার সমতুল্য। একে বলা হয় ‘ইমপিচমেন্ট’। নিয়ম অনুযায়ী: ১. সংসদের দুই কক্ষে এই প্রস্তাব পেশ হওয়ার পর ভোটাভুটি হতে হবে। ২. উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ (Special Majority) সমর্থন প্রয়োজন। ৩. এরপর সেই প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত স্বাক্ষর মিললে তবেই অপসারিত হবেন সিইসি।
দেশের ইতিহাসে আগে কখনও কোনও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। ফলে সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে এই প্রস্তাব পাস হওয়া কঠিন হলেও, লোকসভা নির্বাচনের আগে জাতীয় স্তরে বিজেপির ওপর নৈতিক চাপ তৈরি করতে বিরোধীরা এই অস্ত্রকে সফলভাবে ব্যবহার করল বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। এখন দেখার, সংসদের পিচে এই লড়াই কতদূর গড়ায়।