ভারতের ইতিহাসে প্রথম! মোদী-ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে কি পদ খোয়াচ্ছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার?

ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল সংসদ। এই প্রথম দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারকে পদচ্যুত করার লক্ষ্যে সংসদের উভয় কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পেশ করল বিরোধী শিবির। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং আম আদমি পার্টিসহ গোটা ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অভিযোগ— নিরপেক্ষতার গণ্ডি পেরিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সরাসরি বিজেপির হয়ে কাজ করছেন।

শুক্রবার লোকসভার ১৩০ জন এবং রাজ্যসভার ৬৩ জন সাংসদ এই ঐতিহাসিক অনাস্থা প্রস্তাবের নোটিশে স্বাক্ষর করেছেন। সূত্রের খবর, বেশ কয়েকজন নির্দল সাংসদও এই পদক্ষেপে সামিল হয়েছেন। বিরোধী শিবিরের মূল অভিযোগ, ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার সময় বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে এবং বিরোধীদের কোণঠাসা করতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন।

অভিযোগের পাহাড়: উচ্চপর্যায়ের সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মোট সাতটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। যার মধ্যে প্রধান হলো:

  • নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বৈষম্যমূলক এবং পক্ষপাতমূলক আচরণ।

  • নির্বাচনী কারচুপির তদন্তে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা প্রদান।

  • বিজেপি বিরোধী রাজ্যগুলোতে গণহারে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া।

  • জীবিত ব্যক্তিদের ‘মৃত’ দেখিয়ে তালিকা থেকে নাম মুছে ফেলা।

বাংলার প্রসঙ্গ ও মমতার লড়াই: বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্যান্য অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। অভিযোগ উঠেছে, যোগ্য ভোটার ও সংখ্যালঘুদের নাম পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই সমস্যার কথা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরে গিয়ে দেখা করেছেন এবং চিঠি লিখেছেন। এমনকি সম্প্রতি ৬-১০ মার্চ ধর্মতলায় মেট্রো চ্যানেলে এই ইস্যুতে অবস্থান বিক্ষোভও করেছেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে, ভোটার তালিকায় নাম তুলতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যেমন হয়রানির শিকার হয়েছেন, তেমনই কাজের চাপে বিএলও-দের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

আইনি জটিলতা ও অপসারণ প্রক্রিয়া: মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল, যা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের সমতুল্য। ‘জাজেস এনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৬৮’ অনুযায়ী, এই প্রস্তাব পাস হতে গেলে সংসদের উভয় কক্ষে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। উপস্থিত সাংসদদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন ছাড়া জ্ঞানেশ কুমারকে সরানো সম্ভব নয়। প্রস্তাব গৃহীত হলে সংসদের চেয়ারম্যান ও অধ্যক্ষ একটি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করবেন। যদি তদন্তে ‘অসদাচরণ’ বা ‘অক্ষমতা’ প্রমাণিত হয়, তবেই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।

ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন সংসদের এই সংঘাত আগামী দিনে দেশের রাজনীতিতে বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।