আমবাগান উধাও, এখন সেখানে মন্ত্রীর সুইমিং পুল! সিঙ্গুরে বেআইনি নির্মাণের অভিযোগে তোলপাড় হাইকোর্ট

যে সিঙ্গুর আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, যে জমি রক্ষার লড়াই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাইটার্স বিল্ডিংসের মসনদে বসিয়েছিল, আজ সেই সিঙ্গুরই দেখল এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। আন্দোলনের সেই ‘পবিত্র’ কৃষিজমিতেই এবার মাথা তুলেছে রাজ্যের মন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রীর এক সুবিশাল ও বিলাসবহুল বাংলো। অভিযোগ, সরকারি নথিতে জমিটি ‘কৃষিজমি’ হিসেবে নথিভুক্ত থাকলেও, কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক সুইমিং পুল সম্বলিত প্রাসাদ। এই ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন চন্দননগরের বাসিন্দা আইনজীবী সুপর্ণা দত্ত।
হলফনামাতেই লুকিয়ে দুর্নীতির বীজ? মামলার আবেদনে জানানো হয়েছে, মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের নির্বাচনী হলফনামাতেই এই সম্পত্তির উল্লেখ রয়েছে। ২০২০ সালে সিঙ্গুর ব্লকে এই জমিটি কিনেছিলেন তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন। নথিপত্রে জমিটির চরিত্র ‘কলাবাগান’ বা ‘আমবাগান’ অর্থাৎ কৃষিজমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার আইন (LR Act) অনুযায়ী, কৃষিজমির চরিত্র বদল না করে সেখানে কোনো পাকা ইমারত নির্মাণ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। মামলাকারীর প্রশ্ন, জমির চরিত্র পরিবর্তন না করেই এমন রাজকীয় বাংলো তৈরির নকশা অনুমোদন করল কোন পঞ্চায়েত? নাকি মন্ত্রীর পরিচয়ই এখানে সব আইনের ঊর্ধ্বে?
সিঙ্গুর আন্দোলনের আবেগে আঘাত? ২০০৬ সালে টাটাদের ন্যানো কারখানার বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক ২৬ দিনের অনশন এবং জমি ফেরানোর লড়াই আজ ইতিহাসের পাতায়। টাটারা চলে গিয়েছে গুজরাতে, কিন্তু সিঙ্গুরের কৃষকদের সব জমি আজও চাষযোগ্য হয়ে ওঠেনি। এই আবহে আন্দোলনের সেই প্রাণকেন্দ্রে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পরিবারের এই ‘বেআইনি’ বিলাসবহুল জীবনযাপন স্থানীয় মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করেছে। আইনজীবী সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, পঞ্চায়েত আইন এবং ভূমি সংস্কার আইন—উভয়কেই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখানো হয়েছে এই নির্মাণে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন পঞ্চায়েত থেকে ব্লক প্রশাসন—কেন এই বিশালাকার বাংলো তৈরি হতে দেখেও চুপ ছিল, তা নিয়ে সরব হয়েছেন মামলাকারী। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে দায়ের হওয়া এই জনস্বার্থ মামলার শুনানি হতে পারে মার্চের শেষ সপ্তাহে। হাইকোর্ট এই বাংলো ভাঙার নির্দেশ দেয় নাকি চরিত্র বদল নিয়ে কোনো কড়া পদক্ষেপ করে, এখন সেটাই দেখার। রাজনৈতিক মহলের মতে, লোকসভা ভোটের আগে সিঙ্গুরের জমিতে মন্ত্রীর এই ‘অবৈধ’ বাংলো বিতর্ক শাসক দলের অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।