যুদ্ধের আগুনও থামাতে পারল না ভারতকে! উত্তপ্ত হরমুজ প্রণালী দিয়ে বুক চিতিয়ে বেরোল ‘পুষ্পক’ ও ‘পরিমল’

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের গর্জনে ভারী, যখন বিশ্বের তাবড় শিপিং সংস্থাগুলো হরমুজ প্রণালীকে ‘ডেথ জোন’ ঘোষণা করে জাহাজ চালানো বন্ধ করে দিয়েছে, ঠিক তখনই অবিশ্বাস্য এক ঘটনা ঘটাল ভারত। যুদ্ধের লেলিহান শিখা এড়িয়ে সম্পূর্ণ নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করল ভারতের দুটি বিশাল তেলবাহী ট্যাঙ্কার— ‘পুষ্পক’ ও ‘পরিমল’। যখন থাইল্যান্ড বা ইরাকের জাহাজগুলো হামলার মুখে পড়ছে, তখন ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজের এই রাজকীয় যাত্রাকে দিল্লির ‘মাস্টারস্ট্রোক’ কূটনীতি হিসেবেই দেখছে বিশ্ব মহল।
বারুদের স্তূপে ভারতের ‘সেফ প্যাসেজ’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও ইরানের ত্রিমুখী সংঘর্ষে পারস্য উপসাগর এখন কার্যত রণক্ষেত্র। ইরান স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে, শত্রুপক্ষের কোনও জাহাজকে তারা ছেড়ে দেবে না। ইতিমধ্যেই ‘এমভি মায়ুরি নারি’ বা ‘স্টার গুইনেথ’-এর মতো আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও ভারতীয় জাহাজকে কেন পথ ছাড়ল ইরান? জানা গিয়েছে, এর নেপথ্যে রয়েছে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের তুখোড় কূটনীতি। তিনি সরাসরি ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, ভারত কোনও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের পক্ষ নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক অংশীদার। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটলে তার দায় যে তেহরানের ওপর বর্তাবে, তা সরাসরি জানিয়ে দিয়েছিল দিল্লি।
তেহরানের পাল্টা বার্তা ও ভারতের মানবিক সৌজন্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় ট্যাঙ্কারকে পথ ছেড়ে দিয়ে ইরান বিশ্বকে একটি বিশেষ বার্তা দিতে চেয়েছে। তেহরান দেখাতে চাইছে যে, তাদের লড়াই শুধুমাত্র প্রতিপক্ষ দেশগুলোর (মার্কিন ও ইজরায়েল) বিরুদ্ধে। যারা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, তাদের প্রতি ইরান নমনীয়। শুধু তাই নয়, এর পিছনে কাজ করছে ভারতের মানবিক সৌজন্যও। বর্তমানে প্রায় ২৫০ জন ইরানি নাবিক ভারতে আটকা পড়ে আছেন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের কেবল আশ্রয়ই দেয়নি, বরং সসম্মানে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়াও চালাচ্ছে। ভারতের এই আন্তরিকতায় ইরানও যে খুশি, তা বলাই বাহুল্য।
অপেক্ষায় আরও আটটি জাহাজ ‘পুষ্পক’ ও ‘পরিমল’ নিরাপদে ফিরে আসায় ভারতের তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, লড়াই এখনও শেষ হয়নি। সূত্রের খবর, হরমুজ প্রণালীর বাইরে এখনও ভারতের আরও ৮টি এলপিজি ট্যাঙ্কার অপেক্ষমান। নিরাপত্তাজনিত কারণে সেগুলোকে আপাতত আটকে রাখা হয়েছে। দিল্লি ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং মনে করা হচ্ছে খুব দ্রুত সেগুলোকে পাহারা দিয়ে নিরাপদ পথে নিয়ে আসা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই অশান্ত সময়ে ভারত যেভাবে নিজের স্বার্থরক্ষা করছে, তা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের ক্রমবর্ধমান শক্তিরই পরিচয়।