রাতে ঘুম হচ্ছে না? আপনার অজান্তেই কি দানা বাঁধছে মারাত্মক অপরাধপ্রবণতা ও আত্মঘাতী চিন্তা?

আমরা কি এক চরম অনিদ্রার যুগে বাস করছি? বর্তমান প্রজন্মের কাছে ঘুম যেন এক বিলাসিতা। কিন্তু এই ঘুমের অভাবই যে আমাদের সমাজকে এক ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তার প্রমাণ দিলেন চিকিৎসকরা। শুক্রবার বিশ্ব ঘুম দিবস উপলক্ষে কলকাতায় আয়োজিত ‘স্লিপ ওয়েল, লিভ বেটার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় উঠে এল এমনই সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওয়ার্ল্ড স্লিপ সোসাইটি এবং ক্যালকাটা স্লিপ সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানালেন, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বাড়ছে লাগামহীন আগ্রাসন এবং আত্মহত্যার প্রবণতা।
মস্তিষ্কে ঘুমের প্রভাব ও আচরণের বদল স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সৌরভ দাস জানান, ঘুম কোনো সাধারণ বিশ্রাম নয়, এটি একটি জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া যা মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ তার কার্যক্ষমতা হারায়। ফলে নেতিবাচক আবেগের প্রতি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এর অর্থ হলো, সামান্য কোনো বিরক্তির কারণে একজন মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চরম হিংস্র বা আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে।
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তথ্য বলছে, প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী প্রয়োজনীয় আট থেকে দশ ঘণ্টা ঘুমায় না। আমেরিকার এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৭৩ শতাংশ হাইস্কুল পড়ুয়া পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত। ভারতের চিত্রটিও ভয়াবহ। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB)-র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৭৯৯, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৭১ হাজার ৪১৮-এ। এর মধ্যে পড়ুয়াদের চরম পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনাও লাফিয়ে বেড়েছে ৮,৪২৩ থেকে ১৩,৮৯২-এ। চিকিৎসকদের মতে, এই ভয়াবহ বৃদ্ধির পিছনে অন্যতম অনুঘটক হলো ‘ক্রনিক স্লিপ ডিপ্রাইভেশন’ বা দীর্ঘদিনের ঘুমের অভাব।
কেন কমছে ঘুম? বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত তিনটি কারণ এর জন্য দায়ী: ১. পড়াশোনার অত্যধিক চাপ ও প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়। ২. গভীর রাত পর্যন্ত স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার। ৩. বয়ঃসন্ধিকালে শরীরের জৈবিক ঘড়ির পরিবর্তন এবং ভোরে স্কুল শুরু হওয়া।
ক্যালকাটা স্লিপ সোসাইটির সভাপতি তথা ইএনটি সার্জেন উত্তম আগরওয়াল সতর্ক করে বলেন, “ব্যস্ত জীবনে আমরা ঘুমকে অবহেলা করছি। কিন্তু সঠিক ঘুমের অভ্যাস না থাকলে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা অসম্ভব।”
সমাধানের পথ: ‘৩:২:১’ সূত্র বিশেষজ্ঞরা সুস্থ জীবনের জন্য একটি সহজ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন:
-
৩ ঘণ্টা আগে: ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের ভারী খাবার খেয়ে নিন।
-
২ ঘণ্টা আগে: সমস্ত পেশাদার বা পড়াশোনার কাজ বন্ধ করে দিন।
-
১ ঘণ্টা আগে: মোবাইল, ল্যাপটপ বা যেকোনো ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করুন।
পর্যাপ্ত ঘুম কেবল শরীর নয়, মনের স্বাস্থ্য রক্ষাতেও অপরিহার্য। আজকের দ্রুতগতির জীবনে টিকে থাকতে হলে ঘুমের সাথে আপস করা চলবে না—বিশ্ব ঘুম দিবসে এটাই ছিল বিশেষজ্ঞদের মূল বার্তা।