একই জাতি, দুই দেশ: ব্রিটিশদের টানা এক লজিকহীন রেখায় কেন জ্বলছে পাক-আফগান সীমান্ত? জানুন আসল রহস্য

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবথেকে তপ্ত এবং অস্থির অঞ্চলের নাম পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত, যা বিশ্বজুড়ে ‘ডুরান্ড লাইন’ (Durand Line) নামে পরিচিত। ২,৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তরেখাটি কেবল একটি মানচিত্রের দাগ নয়, বরং এটি দেড়শ বছরের পুরনো এক ক্ষোভের নাম। সাম্প্রতিক সময়ে এই সীমান্ত বরাবর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও ব্রিটিশ কূটনীতি এই বিরোধের শিকড় প্রোথিত রয়েছে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। ১৮৯৩ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বিদেশ সচিব স্যার মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগান আমির আবদুর রহমান খানের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে এই সীমান্ত নির্ধারিত হয়। ব্রিটিশদের লক্ষ্য ছিল রাশিয়ান সাম্রাজ্যের বিস্তার রুখতে একটি ‘বাফার জোন’ তৈরি করা। কিন্তু এই রেখা টানার সময় স্থানীয় মানুষের আবেগ বা জাতিগত অবস্থানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান এই ডুরান্ড লাইনকে উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে গ্রহণ করে। তবে আফগানিস্তান শুরু থেকেই এই রেখাকে অস্বীকার করে আসছে।

কেন এই সীমানা নিয়ে এত বিতর্ক? আফগানিস্তানের আপত্তির প্রধান কারণ হলো ‘পশতুন’ জাতিগোষ্ঠীর বিভাজন। ডুরান্ড লাইন পশতুন অধ্যুষিত এলাকাকে মাঝখান থেকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। এই সীমান্তের দুই পারের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং আত্মীয়তার বন্ধন এক। আফগান শাসকদের দাবি, ব্রিটিশরা জোর করে তাদের ভূমি কেড়ে নিয়েছিল এবং এই কৃত্রিম সীমানা পশতুনদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার কেড়ে নিয়েছে। কোনো ঐতিহাসিক চুক্তিই আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের ওপর চিরস্থায়ী হতে পারে না—এই যুক্তিতেই কাবুল আজও ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

পাকিস্তানের অবস্থান ও বর্তমান সংঘাত পাকিস্তান তার নিরাপত্তার স্বার্থে এই সীমান্তকে সিল করে দেওয়ার পক্ষপাতি। ইসলামাবাদের দাবি, এই সীমান্ত দিয়ে সন্ত্রাসবাদ এবং চোরাচালান নিয়ন্ত্রিত হয়। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই এই সীমান্তের প্রায় ৯৮ শতাংশ এলাকা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেছে এবং অসংখ্য চেকপোস্ট ও বাঙ্কার তৈরি করেছে। আফগানিস্তান এই বেড়া নির্মাণকে অবৈধ দখলদারিত্ব হিসেবে দেখে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের নেপথ্যে রয়েছে এই কাঁটাতারের বেড়া মেরামতি এবং সীমান্ত পোস্ট দখলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ইগো।

বর্তমানে ডুরান্ড লাইন কেবল একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, এটি ইতিহাস, নিরাপত্তা এবং কূটনীতির এক জটিল গোলকধাঁধা। দুই দেশের গোলাগুলি এবং পাল্টাপাল্টি হুঙ্কার দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।