কলকাতার ‘শেরিফ’ আর নেই: ‘চৌরঙ্গী’ থেকে ‘জন অরণ্য’, শংকরের কলম থামল ৯২ বছরে!

তিলোত্তমা কলকাতার অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে থাকা অজস্র না বলা গল্পদের যিনি মুক্তি দিয়েছিলেন, সেই কিংবদন্তি কথাকার মণি শঙ্কর মুখোপাধ্যায়, পাঠককুলে যিনি ‘শংকর’ নামেই জনপ্রিয়, ৯২ বছর বয়সে পাড়ি দিলেন অমৃতলোকে। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যের একটি বর্ণময় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। ১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্ম নেওয়া এই মানুষটিই ১৯৫৫ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’-এর মাধ্যমে বাঙালির পড়ার টেবিল দখল করেছিলেন। কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডারিক বারওয়েলের সাহচর্যে তাঁর যে জীবনবোধ তৈরি হয়েছিল, তাই পরবর্তীকালে সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে ধরা দেয়।
শংকরের লেখায় কলকাতা কেবল একটি শহর ছিল না, ছিল এক জীবন্ত চরিত্র। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসটি সাহেবপাড়ার হোটেলের নেপথ্য জীবনকে যেভাবে তুলে ধরেছিল, তা আজও বিশ্বসাহিত্যের মানে অতুলনীয়। বেকারত্ব, মধ্যবিত্তের নৈতিক অবক্ষয় আর দুর্নীতির অন্ধকার চোরাবালি ফুটে উঠেছিল তাঁর ‘জন অরণ্য’ উপন্যাসে, যা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। শিক্ষিত যুবকের ‘দালাল’ হয়ে ওঠার সেই কঠোর বাস্তব আজও সমান প্রাসঙ্গিক। ‘সীমাবদ্ধ’ উপন্যাসে উচ্চাকাঙ্ক্ষার লড়াই আর নৈতিকতার পতনকে তিনি যেভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন, তা পাঠককে বারবার ভাবিয়ে তুলেছে।
সাহিত্যিক জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২০ সালে ‘একা একা একাশি’র জন্য তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। শুধু সাহিত্য নয়, কলকাতার নাগরিক জীবনেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য; ২০১৯ সালে তিনি এই শহরের ‘শেরিফ’ মনোনীত হয়েছিলেন। ঋত্বিক ঘটক তাঁর উপন্যাস নিয়ে নাটক করতে চেয়েছিলেন, সত্যজিৎ রায় বানিয়েছিলেন অমর সিনেমা। আজ সেই কলম থেমে গেল, যার হাত ধরে বাঙালি চিনেছিল এক ‘অন্য কলকাতা’কে। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সাহিত্য জগৎ থেকে সাধারণ পাঠককুল।