মরণঠান্ডা নাকি অসহ্য গরম? কোন ঋতুতে ভয়ে কাঁপত মুঘল সেনারা? জানলে অবাক হবেন!

মুঘলরা এসেছিল মধ্য এশিয়া থেকে, যেখানে শীত ছিল তাদের চেনা। কিন্তু ভারতের দিল্লি, আগ্রা বা লাহোরের জলবায়ু তাদের সামনে এমন এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল, যা অনেক বড় যুদ্ধের চেয়েও ভয়ংকর ছিল। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, গ্রীষ্মের দহন নয়, বরং উত্তর ভারতের হাড়কাঁপানো শীতকালই ছিল মুঘল সালতানাতের জন্য সবচেয়ে বড় ‘বিপদ’। কেন শীতকালকে মুঘল সেনাবাহিনীর যম মনে করা হতো? আসুন জেনে নিই।
কুয়াশার চাদরে ঢাকা রণকৌশল উত্তর ভারতে শীতের ঘন কুয়াশা মুঘলদের অগ্রযাত্রায় প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াত। দৃশ্যমানতা বা ভিজিবিলিটি কমে যাওয়ায় শত্রুর ওপর নজরদারি চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ত। দিন ছোট আর রাত বড় হওয়ায় সামরিক অভিযানের সময় কমে আসত। ফলে হঠাৎ আক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেত বহুগুণ। পাঞ্জাব থেকে আগ্রা—পুরো এলাকা তখন কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকত, যা মুঘলদের গতি কমিয়ে দিত।
পশুদের মৃত্যু ও যাতায়াতের সংকট মুঘল সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড ছিল হাতি, ঘোড়া আর উট। কনকনে ঠান্ডায় এই প্রাণীদের চলাচল করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত। দীর্ঘ পথ চলতে গিয়ে ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায় অসংখ্য পশু মারা যেত, যা রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিত। বিশেষ করে কাশ্মীর বা আফগান সীমান্তে যাওয়ার পথে তুষারপাত ও ভূমিধস মুঘলদের মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দিত।
রেশনের অভাব ও কৃষক অসন্তোষ শীতকাল মানেই ছিল গম এবং রবি শস্য বপনের সময়। এই সময় বিশাল সেনাবাহিনীর জন্য রেশন জোগাড় করা ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকদের ওপর জোর করে রেশনের চাপ দিলে বিদ্রোহের আশঙ্কা থাকত। তাই মুঘল সম্রাটদের সবসময় শীত আসার আগেই পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত নিশ্চিত করতে হতো।
পোশাক ও কাঠের লড়াই তীব্র শীতে সৈন্যদের বাঁচিয়ে রাখতে প্রচুর আগুনের প্রয়োজন হতো। কিন্তু বন থেকে কাঠ কেটে তা পশুদের পিঠে চাপিয়ে শিবিরে পৌঁছানো ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ। এছাড়া রাজকীয় কারখানাগুলোতে পশমিনা ও পশমের পোশাক তৈরির ধুম পড়ত, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সৈন্যদের লেপ-কম্বল সরবরাহ করা ছিল শাহী কোষাগারের ওপর বড় এক বোঝা।
চিকিৎসায় সীমাবদ্ধতা সেই যুগে আধুনিক চিকিৎসা ছিল না। নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট আর জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যেত হাজার হাজার সৈন্য। পাহাড়ি অঞ্চলে অভিযান চালানোর সময় হাড়কাঁপানো বাতাস আর পিচ্ছিল পথ জয় করা তাদের জন্য অসম্ভবের কাছাকাছি হয়ে যেত। এই কারণেই অনেক মুঘল সম্রাট শীতকাল আসার আগেই যুদ্ধ শেষ করার বা সন্ধি করার চেষ্টা করতেন।