মাঝরাতে আজও কি শোনা যায় নূপুরের ধ্বনি? টালিগঞ্জের এই মন্দিরের করুণ কাহিনী আপনার চোখে জল আনবে

দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ততম মোড় টালিগঞ্জ। ট্রাম, বাস আর ভিড়ের শব্দে মুখরিত এই তল্লাটের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘করুণাময়ী কালীমন্দির’। দিনের আলোয় হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত থাকলেও, এই মন্দিরের শান্ত গর্ভগৃহের ভেতরে লুকিয়ে আছে আড়াইশো বছরের পুরনো এক গভীর বিষাদ আর ভক্তির ইতিহাস। কেবল ধর্মস্থান হিসেবে নয়, এই মন্দির দাঁড়িয়ে আছে এক বাবার অসীম পিতৃস্নেহের স্মৃতি হিসেবে।

ইতিহাস ও করুণ কাহিনী: অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশের জমিদার নন্দদুলাল রায়চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত প্রতিপত্তিশালী। কিন্তু অগাধ ঐশ্বর্যও তাঁর একমাত্র কন্যা ‘করুণাময়ী’-র অকালমৃত্যু ঠেকাতে পারেনি। আদরের মেয়ের মৃত্যুতে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন নন্দদুলাল। কথিত আছে, সেই শোকের সাগরে ডুবে থাকাকালীনই এক রাতে তিনি স্বপ্নাদেশ পান। দেবী স্বয়ং তাঁকে দর্শন দিয়ে একটি বিশেষ কষ্টিপাথরের হদিশ দেন।

** কন্যার নামে দেবী:** পরদিন সেই স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট জায়গা থেকে কষ্টিপাথরটি উদ্ধার করা হয়। নন্দদুলাল বুঝতে পারেন, মা কালী তাঁর কন্যার রূপেই ধরা দিয়েছেন। তাই দেবীর মূর্তিও গড়া হয় শান্ত, মমতাময়ী রূপে—যা অন্যান্য কালীমূর্তির উগ্র বা ভয়ঙ্কর রূপের থেকে একদমই আলাদা। নিজের প্রয়াত কন্যার নামানুসারেই এই মন্দিরের নাম রাখা হয় ‘করুণাময়ী কালীমন্দির’। আজও এখানে দেবী পূজিত হন ঘরের মেয়ের স্নেহে।

রহস্য ও বিশ্বাস: স্থানীয়দের বিশ্বাস, ভক্তরা এখানে কিছু মানত করলে মা করুণাময়ী কাউকেই খালি হাতে ফেরান না। তবে ইতিহাসের পাশাপাশি এই মন্দির ঘিরে রয়েছে রোমাঞ্চকর লোকগাথাও। অনেক ভক্ত দাবি করেন, অমাবস্যার নিশীথে বা কালীপুজোর গভীর রাতে মন্দির চত্বরে অলৌকিক অনুভূতি হয়। কেউ কেউ বলেন, মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে ভেসে আসে অস্পষ্ট নূপুরের নিক্বণ—যেন সেই ছোট্ট করুণাময়ী আজও তাঁর বাবার গড়া মন্দিরে ঘুরে বেড়ায়। আধুনিক সংস্কার হলেও মন্দিরের প্রতিটি ইটে আজও মিশে আছে সেই শতাব্দী প্রাচীন বিরহ আর ভক্তির আখ্যান।