বিদায়বেলায় ঐতিহ্যের কান্না! কেন বন্ধ হতে চলেছে কলকাতার শতাব্দী প্রাচীন এই হেরিটেজ পুজো?

কলকাতার আনাচে-কানাচে লুকিয়ে আছে অজস্র ইতিহাস। কিন্তু সেই ইতিহাসের একটা বড় অধ্যায় এবার চিরতরে মুছে যাওয়ার পথে। উত্তর কলকাতার বিধান সরণির নিউ ল কলেজ হস্টেল—যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলী আর রথী-মহারথীদের পদধূলি। কিন্তু বিষাদের সুর বেজেছে এই হস্টেলের শতাব্দী প্রাচীন সরস্বতী পুজোয়। সম্ভবত, ২০২৬ সালের এই পুজোটাই ছিল নিউ ল কলেজ হস্টেলের শেষ বাগদেবী আরাধনা।
নক্ষত্রখচিত ইতিহাস: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত এই হস্টেল ভবনটি উনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত। এই ছাত্রাবাসটি ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত প্রণব মুখোপাধ্যায়, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের ছাত্রজীবনের সাক্ষী। শুধু কবি বা সাহিত্যিক নন, ভারতের অসংখ্য নামী আইনজীবী এবং বিচারপতিদেরও হাতেখড়ি হয়েছে এই হস্টেলে থেকে। স্বামী বিবেকানন্দের বাসভবন কিংবা ব্রাহ্মসমাজের মন্দিরের খুব কাছে অবস্থিত এই ভবনটি নিজেই এক জীবন্ত ইতিহাস।
শেষবারের মতো মন্ত্রোচ্চারণ: এবারের সরস্বতী পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব ছিল সংস্কৃত বিশেষজ্ঞ আচার্য অনুভব হাজরার নেতৃত্বে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ এবং গানের মাধ্যমে দেবীর আবাহন। বিগত ৬ বছর ধরে তিনি এখানে পুজো পরিচালনা করছেন। তবে এবার পুজোর আনন্দের মাঝেও ছিল একটা চোরা দীর্ঘশ্বাস। হস্টেলের বর্তমান ও প্রাক্তনীরা জানেন, বয়সের ভারে জীর্ণ এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটিকে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভবনটি ভেঙে ফেলা মানে শুধু ইঁট-কাঠের কাঠামো ধ্বংস হওয়া নয়, বরং শতাব্দী প্রাচীন এক ঐতিহ্যের অবসান ঘটা।
স্মৃতি রক্ষার আর্তি: এত দীর্ঘ সময় ধরে চলা সরস্বতী পুজো কলকাতা তো বটেই, গোটা রাজ্যেই বিরল। ভবনটি ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন অসংখ্য প্রাক্তন ছাত্র এবং বিশিষ্টজনেরা। তাঁদের দাবি, ভবনটিকে রক্ষা করা হোক, যাতে এর সাথে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস ধূলিসাৎ না হয়ে যায়। যদি ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়, তবে এই প্রাচীন পুজোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। ঐতিহ্যের এই সঙ্কট মেটাতে শেষমেশ কেউ এগিয়ে আসে কি না, সেটাই এখন দেখার।