ভালো মানুষের কপালে কেন এত দুঃখ? আগের জন্মের কর্মফল নাকি শুধুই পরীক্ষা? যা বলছে শাস্ত্র

জীবনে অনেক সময় এমন কিছু যন্ত্রণা আসে যার কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। শত চেষ্টা সত্ত্বেও বারবার ব্যর্থতা, জন্মগত অসুস্থতা কিংবা প্রিয়জনের বিচ্ছেদ—এই পরিস্থিতিতে আমরা অজান্তেই বলে ফেলি, “হয়তো আগের জন্মের কর্মফল ভোগ করছি।” কিন্তু এটি কি কেবলই লোকবিশ্বাস, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা? হিন্দু ধর্মশাস্ত্র এবং আধ্যাত্মিক দর্শনে এই প্রশ্নের অত্যন্ত স্পষ্ট উত্তর দেওয়া হয়েছে।

গীতার শিক্ষা ও পুনর্জন্ম: শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ২২ নম্বর শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে, আত্মা অবিনশ্বর। মানুষ যেমন পুরনো পোশাক ত্যাগ করে নতুন পোশাক পরে, আত্মাও ঠিক তেমনই পুরনো জীর্ণ দেহ ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করে। এই শ্লোকটি পুনর্জন্মের ধারণাকে ভিত্তি দেয়। গীতা অনুযায়ী, মানুষের অস্তিত্ব কেবল একটি জীবনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘ আধ্যাত্মিক যাত্রার অংশ।

কর্মের জটিল গতি: গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের ১৭ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে যে, কর্মের গতি অত্যন্ত নিগূঢ় ও জটিল। আধ্যাত্মিক গবেষকরা একে ‘প্রারব্ধ কর্ম’ বলে অভিহিত করেন। শাস্ত্র মতে, আমাদের বর্তমান জীবনের জন্মস্থান, শারীরিক গঠন এবং জীবনের বিশেষ কিছু কঠিন পরিস্থিতি আসলে আমাদের অতীত জীবনের সঞ্চিত কর্মফল। যা আমাদের ভোগ করতেই হবে এবং তা অনেকটা পূর্বনির্ধারিত।

উপনিষদের প্রাচীন দলিল: কেবল গীতা নয়, বৃহদারণ্যক উপনিষদেও স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, মানুষ যেমন কর্ম করে, মৃত্যুর পর সে তেমনই পরিণতি লাভ করে। অর্থাৎ কর্মফল এবং পুনর্জন্ম একে অপরের পরিপূরক। এটি কর্মফল তত্ত্বের অন্যতম প্রাচীন এবং শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃত।

কষ্ট কি কেবল শাস্তি? শাস্ত্রে কষ্টকে কেবল নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়নি। গীতা বলে, অনেক সময় কষ্ট আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবে আসে। অনেক ভালো মানুষ কেন কষ্ট পান? এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, যে আত্মা যত বেশি উন্নতির পথে এগোয়, তার পরীক্ষাও তত কঠিন হয়। এটি শাস্তির বদলে আত্মোন্নতির একটি পর্যায় হিসেবে বিবেচিত।

তবে শাস্ত্র একটি আশার বাণীও দেয়—সব কষ্টের দায় আগের জন্মের ওপর চাপিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকা অনুচিত। বর্তমান জীবনের সৎকার্য এবং পুরুষার্থের মাধ্যমে ভবিষ্যতের দুঃখ লাঘব করা সম্ভব। অর্থাৎ বর্তমানের ভালো কাজই পারে আপনার আগামী জীবনের পথ প্রশস্ত করতে।