স্কুলছুট রুখতে রণপা আর লাঠিখেলা! বাংলার লুপ্ত ঐতিহ্য ফিরিয়ে মডেল হয়ে উঠল বর্ধমানের বেলাড় ভূরকুন্ডা উচ্চ বিদ্যালয়

প্রযুক্তির যুগে যখন কচিকাঁচারা মোবাইল গেমে আসক্ত, তখন পূর্ব বর্ধমানের এক প্রত্যন্ত গ্রামের সরকারি স্কুলে শোনা যাচ্ছে রণপার খটখট শব্দ আর লাঠির বনবন আওয়াজ। বইয়ের পাতার পাঠ তো আছেই, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ও আত্মরক্ষার পাঠ। এমনই এক অভাবনীয় উদ্যোগ নিয়েছে রায়না ২ ব্লকের বেলাড় ভূরকুন্ডা উচ্চ বিদ্যালয়।
কেন এই অভিনব উদ্যোগ? স্কুল সূত্রে খবর, এলাকাটি মূলত তপশিলি জাতি অধ্যুষিত। একটা সময় দেখা যাচ্ছিল, অষ্টম শ্রেণীর পর বহু পড়ুয়া স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে। এই ‘স্কুলছুট’ হওয়ার প্রবণতা রুখতে এবং পড়ুয়াদের আকর্ষণ বাড়াতে প্রধান শিক্ষক সুব্রত নায়েক ও শিক্ষক প্রদ্যুৎ গুহ এক মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেন। পাঠ্যবইয়ের একঘেয়েমি কাটাতে তাঁরা স্কুলে অন্তর্ভুক্ত করেন রণপা, লাঠিখেলা ও ক্যারাটের মতো বিষয়।
চক-ডাস্টারের পাশে লাঠি ও রণপা: যে রণপা একসময় সংবাদ আদান-প্রদান বা দ্রুত পথ চলার মাধ্যম ছিল, আজ তা আধুনিক প্রজন্মের কাছে নিছক বিস্ময়। কিন্তু এই স্কুলের মাঠে ছাত্ররা নিয়মিত সেই রণপা নিয়ে অনুশীলন করছে। অন্যদিকে, বর্তমান সময়ে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষকরাই হাতে তুলে নিয়েছেন লাঠি। লাঠিখেলা ও ক্যারাটে শিখে আত্মনির্ভর হয়ে উঠছে ছাত্রীরা।
পড়ুয়ারা যা বলছে: স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কথায়, “যেসব শরীরচর্চা বাইরে টাকা দিয়ে শিখতে হয়, স্কুল আমাদের তা বিনামূল্যে শেখাচ্ছে। এখন স্কুলে আসতে অনেক বেশি ভালো লাগে। আমরা শিখছি কীভাবে বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হয়।”
সফলতার খতিয়ান: ১৯৭০ সালে মাত্র ৬৬ জন পড়ুয়া নিয়ে শুরু হওয়া এই স্কুলে এখন ২৬০ জন ছাত্রছাত্রী। শিক্ষকদের এই আন্তরিক প্রচেষ্টায় স্কুলে পড়াশোনার পরিবেশ বদলে গিয়েছে। কেবল আত্মরক্ষা নয়, নাচ, গান ও আঁকার মতো সৃজনশীল বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে এখানে। আধুনিক যুগে শেকড়কে আঁকড়ে ধরেও যে পড়ুয়াদের আত্মনির্ভর করে তোলা সম্ভব, তা প্রমাণ করে দেখাচ্ছে এই স্কুল। শিক্ষার এই অনন্য মডেলটি এখন অন্যান্য সরকারি স্কুলের কাছে বড় অনুপ্রেরণা।