‘মুর্শিদাবাদ দাঙ্গা চায় না’- ফিরহাদের কঠোর পদক্ষেপের পর সম্প্রীতির ডাক মমতার! কেন ৬ ডিসেম্বরকে ‘সম্প্রীতি দিবস’ বললেন তৃণমূলনেত্রী?

ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের ‘বাবরি মসজিদ’ তৈরির ঘোষণা নিয়ে রাজ্য রাজনীতি যখন উত্তপ্ত, ঠিক তখনই তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এলো কড়া বার্তা। বুধবার মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে প্রশাসনিক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঐতিহাসিক সিরাজ-উদ-দৌল্লার মাটিকে সাক্ষী রেখে সর্বধর্ম সমন্বয়ের ডাক দিলেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, “মুর্শিদাবাদ জেলায় দাঙ্গা মানুষ পছন্দ করে না।”
মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তৃতার কয়েক ঘণ্টা আগেই কলকাতায় তৃণমূল ভবনে জরুরি সাংবাদিক বৈঠকে দলের শীর্ষ নেতা ফিরহাদ হাকিম ঘোষণা করেন, দলবিরোধী কার্যকলাপ এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক মন্তব্যের জেরে হুমায়ুন কবীরকে দল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে।
‘বিজেপির দাবার বোড়ে’— ফিরহাদের তোপ
ফিরহাদ হাকিম হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে তোপ দেগে বলেন, “বাংলায় আমরা সবাই একসঙ্গে থাকি। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার—এটাই বাংলার সংস্কৃতি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে দেখা গেল, আমাদের দলের একজন সদস্য ‘বাবরি মসজিদ’ তৈরির নাম করে বিভাজনের রাজনীতি করার চেষ্টা করছেন।” ফিরহাদের অভিযোগ, হুমায়ুন কবীর আসলে বিজেপির ‘ইন্সট্রুমেন্ট’ বা দাবার বোড়ে হিসেবে কাজ করছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “কেন বাবরি মসজিদ? নিজের বাবা-মায়ের নামে বা কোনও শহীদের নামে মসজিদ কেন করলেন না? বেলডাঙার মতো সংবেদনশীল জায়গায় এই ঘোষণা করে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
মমতার মুখে ‘মীরজাফর’ উপমা
কলকাতায় যখন দল এই কঠোর অবস্থান ঘোষণা করছে, ঠিক তখন মুর্শিদাবাদে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাম না করে বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে সরব হন। তিনি ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “এই মুর্শিদাবাদ জেলাতেই একদিন নবাবদের রাজধানী ছিল…পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ যুদ্ধ হয়েছিল। সিরাজ-উদ-দৌল্লা মীরজাফরের মাথায় মুকুট পরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, স্বাধীনতা রক্ষা করো। কিন্তু মীরজাফর তা করতে দেয়নি”। রাজনৈতিক মহলের মতে, নাম না-করে মুখ্যমন্ত্রী বিভাজন সৃষ্টিকামী নেতাদের ‘মীরজাফর’-এর সঙ্গেই তুলনা করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় ৬ ডিসেম্বরের প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন এবং মনে করিয়ে দেন, এই দিনটিকে তৃণমূল কংগ্রেস গত ৩৩ বছর ধরে ‘সম্প্রীতি দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে, কোনও প্ররোচনার দিন হিসেবে নয়।
‘মেজোরিটি রক্ষা করবে মাইনরিটিকে’
সম্প্রীতির বার্তা দিতে গিয়ে মমতা মানবদেহের উপমা ব্যবহার করে বলেন, “আমাদের রাজ্যে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান—সবাই আছে। চোখ, নাক, কান ছাড়া যেমন শরীর চলে না, তেমনই সব ধর্মকে নিয়েই সমাজ চলে।” তিনি বলেন, “নিয়ম তো এটাই, মেজোরিটি যাঁরা আছেন তাঁরা মাইনরিটিদের রক্ষা করবেন। আর যাঁরা মাইনরিটি আছেন তাঁরা মেজোরিটিদের রক্ষা করবেন। এটাই সর্বধর্ম সমন্বয়।” তিনি মনে করিয়ে দেন, বাংলার মাটি নবজাগরণের মাটি, এখানে বিভাজনের রাজনীতির কোনও জায়গা নেই।
ফিরহাদ হাকিম স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, হুমায়ুন কবীর অতীতে বারবার দলবদল করেছেন এবং তৃণমূলের প্রশাসন কোনওভাবেই রাজ্যে অরাজকতা বরদাস্ত করবে না। দলনেত্রী ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমোদনক্রমেই এই সাসপেনশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।