‘টহল’ বা ‘ভোরাই গান’, আধুনিকতার ভিড়েও কতিপয় গ্রামে টিকে আছে গ্রামীণ সংস্কৃতি, কাঁধে খোল-করতাল নিয়ে গ্রাম পরিক্রমা!

দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে বহু প্রাচীন গ্রাম্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে। এক সময়ে গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ‘টহল’ বা ‘ভোরাই গান’—যা ভোরবেলায় শুনে ঘুম ভাঙত গ্রামবাসীর। গ্রামের মঙ্গল কামনায় কার্তিক মাস জুড়ে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মানুষজন কাঁধে খোল-করতাল নিয়ে হরিনাম সংকীর্তনের তরঙ্গ তুলে গ্রাম পরিক্রমা করতেন। কিন্তু বর্তমানে এই ঐতিহ্যটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।

একটা সময় প্রতিটি গ্রামেই টহলের এই দৃশ্য দেখা গেলেও, এখন তা দেখা খুবই দুষ্কর।

এখনও টিকে আছে যেখানে:

এখনও কতিপয় গ্রামে এই পুরনো ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। তেমনই এক উদ্যোগ দেখা যায় বর্ধমান ২ নং ব্লকের সোনাপলাশি গ্রামে, যেখানে আজও ভোরবেলায় শোনা যায় এই টহল বা ভোরাই গান।

এই প্রথাটি পালন করছেন মহাদেব বৈরাগ্য, যিনি পূর্বপুরুষদের প্রথা মেনেই এই দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বাবা ও ঠাকুরদা সকলেই গোটা কার্তিক মাস বা দামোদর মাস জুড়ে গোটা গ্রাম ঘুরে এই কৃষ্ণ নাম গেয়ে বেড়িয়েছেন।

সময়কাল: সোনাপলাশি গ্রামে কার্তিক মাস জুড়েই এই গান গাওয়া হয়। ভোর ৩টে নাগাদ তিনি ওঠেন এবং দিনের আলো ফোটা পর্যন্ত এই গান চলে।

দায়িত্ব পালন: মহাদেব জানান, শারীরিক অসুস্থতা থাকলেও তিনি চেষ্টা করেন এই এক মাস ছেদহীনভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে। গান গাওয়ার সময় অনেকেই তাঁকে বাড়িতে ডেকে দু-এক কলি গান গাওয়ার অনুরোধ করেন এবং তিনি যা দেন, তাই গ্রহণ করেন।

নতুন প্রজন্মের কাছে গুরুত্বহীন:

মহাদেব বৈরাগ্য দুঃখের সঙ্গে জানান যে, গ্রামের মানুষের কাছে এখনও ভোরে ওঠা এবং সূর্য ওঠার আগে দুয়ারে জল দেওয়ার মতো কিছু রীতি চলে আসছে, কিন্তু নয়া প্রজন্মের কাছে এর কোনো গুরুত্ব নেই।

তিনি বলেন, “সমাজ আধুনিক মোড়কে যতই মুড়ছে, ততই তাঁদের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে।”

সোনাপলাশি গ্রামের মহাদেব বৈরাগ্যের এই উদ্যোগটি যেন পরিবর্তনের যুগে শিকড়কে আঁকড়ে ধরে থাকার এক নীরব সংগ্রাম—যা নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ সংস্কৃতির মূল্য তুলে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছে।