‘মুক্ত অর্থনীতি’র ভয়ঙ্কর রূপ: এক শতাংশের হাতে সম্পদের পাহাড়, ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হলেও কেন ভারতে ধনী-গরিবের ফারাক আকাশছোঁয়া?

বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে জি-২০ প্যানেলের সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় ফের একবার স্পষ্ট হলো যে, ধন ও সম্পত্তির বন্টনে বৈষম্য এখন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে নতুন সৃষ্ট সম্পদের প্রায় ৬৩ শতাংশ রয়েছে মাত্র এক শতাংশ অতি-ধনী মানুষের হাতে, যেখানে জনসংখ্যার নিচের দিকের ৫০ শতাংশ গরিব মানুষের ভাগে এসেছে মাত্র এক শতাংশ সম্পত্তি।
এই ভয়াবহ বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি নৈতিক, সামাজিক এবং মানবিক সংকটেরও ইঙ্গিতবাহী। উদারীকরণ ও বিশ্বায়নের গত দুই দশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব বৃদ্ধি, প্রযুক্তির বিকাশ এবং বাজারের সম্প্রসারণ ঘটলেও, এই উন্নয়নের সুফল সমভাবে বন্টিত হয়নি। ২০০০ সালে যেখানে বিশ্বের মোট সম্পত্তির ৪৫ শতাংশ ছিল শীর্ষ এক শতাংশের হাতে, ২০২৪ সালে তা ৬৩ শতাংশের উপরে পৌঁছে গেছে।
ভারতে ধনী-গরিবের আকাশছোঁয়া ফারাক
জি-২০ প্যানেলের এই সমীক্ষায় ভারতও ব্যতিক্রম নয়। দেশের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষ মাত্র দুই দশকে তাদের সম্পত্তিতে ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। অক্সফ্যাম ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীর কাছে রয়েছে মোট সম্পদের প্রায় ৭৭ শতাংশ, অন্যদিকে জনসংখ্যার নিচের দিকের ৬০ শতাংশের অংশে আসে মাত্র ৪.৭ শতাংশ সম্পত্তি।
সরকারের দারিদ্র্য দূরীকরণের উদ্যোগের ফলে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে এসেছেন বলে বিশ্ব ব্যাঙ্ক ও সরকারি রিপোর্টে উঠে এলেও, এই অর্থনৈতিক বৈষম্য সমাজে অসন্তোষ, এমনকি সহিংসতা ও বিভেদের জন্ম দিচ্ছে। করোনা মহামারী এই ফারাককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ কর্মহীন হয়েছেন, আর কিছু শিল্পপতির সম্পদ বহুগুণ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ধন-সম্পদের ন্যায়সঙ্গত পুনর্বন্টন, সকলের জন্য সমান সুযোগ এবং সমাজ-কেন্দ্রিক নীতির প্রয়োজন। পাশাপাশি, অতি-ধনীদের কাছ থেকে ন্যায্য কর আদায় নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যবহৃত হতে পারে। ভোটের আগে ‘বিনামূল্যের রেবড়ি’ বিতরণের প্রবণতা বন্ধ করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেওয়াই নতুন ভারতের স্বপ্ন পূরণের একমাত্র পথ।