বিশেষ: ইউটিউব দুনিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা তিনি, জেনেনিন তার সম্পূর্ণ পরিচয়

জিমি ডোনাল্ডসন, নামটির চেয়ে তার ইউটিউব চ্যানেল ‘মিস্টারবিস্ট’ (MrBeast) আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে আবেগ, ভালোবাসা আর অনুপ্রেরণার নাম। বিশাল অঙ্কের পুরস্কার, দানশীলতা, চ্যালেঞ্জিং ভিডিও আর মানবিক উদ্যোগ—সব মিলিয়ে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি আজ ইউটিউব দুনিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা।
শৈশব থেকে ইউটিউবে আগমন
১৯৯৮ সালের ৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসে জন্ম ডোনাল্ডসনের। সেনাবাহিনীর সাবেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মায়ের চাকরির কারণে ছোটবেলা থেকেই পরিবারকে ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করতে হতো। ছোটবেলা থেকেই ছিল জিমির জেদ এবং যে কোনো কাজে ডুবে থাকার অভ্যাস। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পুরোনো ল্যাপটপে ভিডিও বানিয়ে ইউটিউবে আপলোড করা শুরু করেন। ২০১২ সালে তৈরি হয় সেই চ্যানেল—‘মি.বিস্ট৬০০০’।
২০১৬ সালে গ্রিনভিল ক্রিশ্চিয়ান একাডেমি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর মায়ের ইচ্ছায় তিনি ইস্ট ক্যারোলিনা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। কিন্তু দুই সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেন। কারণ তার মন পড়েছিল গাড়ির ভেতর ভিডিও বানানোর দিকে। সেই বছরই জুলাই মাসে তার চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা এক লাখ ছুঁয়ে ফেলে, যা ছিল তার জীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।
ভাইরাল হওয়ার শুরু ও ভিডিওর ধরন পরিবর্তন
২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘আই কাউন্টেড টু $১০০,০০০!$’ ভিডিওটি তাঁকে রাতারাতি ভাইরাল করে দেয়। এরপর থেকেই শুরু হয় তাঁর সাফল্যের রকেট গতি।
একসময় তিনি শুধু গেম এবং অন্য নির্মাতাদের আয় বিশ্লেষণ করতেন। কিন্তু দ্রুতই তাঁর ভিডিওর ধরন বদলে যায়। তিনি শুরু করেন বিশাল অঙ্কের চ্যালেঞ্জ, মানুষকে অবাক করা পুরস্কার এবং মানবিক উদ্যোগে ভরা ভিডিও। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- অন্ধত্ব নিরাময়ে এক হাজার মানুষের চোখের অপারেশন খরচ বহন করা।
- আফ্রিকার জলশূন্য এলাকায় টিউবওয়েল স্থাপন করা।
- কাউকে চাকরি ছেড়ে দিলে $১$ লাখ ডলার পুরস্কার দেওয়া।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “মানুষকে সাহায্য করতে আমার ভালো লাগে। তাদের মুখে আনন্দ দেখি, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।” ২০২৪ সালের মধ্যে তাঁর দান ও পুরস্কারের পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় $৩০$ মিলিয়ন ডলার!
ইউটিউবে ইতিহাসের স্রষ্টা
মিস্টারবিস্টের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিওগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘$৪৫৬,০০০$ স্কুইড গেম ইন রিয়েল লাইফ!’, যা তৈরি করতে খরচ হয়েছিল প্রায় $৩.৫$ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেখা হয়েছে প্রায় $৮৮২$ মিলিয়ন বার।
২০২২ সালে রোলিং স্টোনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউটিউব চ্যানেল হতে চাই।” তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, যখন তাঁর চ্যানেল ইউটিউবে প্রথম $৩০০$ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার অতিক্রম করে। বর্তমানে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা $৪৪৭$ মিলিয়ন বা ৪৪.৭ কোটি, যা ইউটিউব ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিলিয়নিয়ারের তকমা, উদ্যোক্তা ও টিকটক বিতর্ক
মাত্র ২৬ বছর বয়সে, ২০২৪ সালের জুন মাসে, মিস্টারবিস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে বিলিয়নিয়ারের তালিকায় যুক্ত হন। ইউটিউব এবং অন্যান্য ব্যবসা থেকে ২০২৪ সালে তাঁর বার্ষিক আয় ছিল প্রায় $৭০০$ মিলিয়ন ডলার!
তাঁর ব্যবসার মধ্যে রয়েছে:
- ফিস্টট্যাবলস: চকোলেট বার উৎপাদনকারী কোম্পানি।
- মিস্টারবিস্ট বার্গার: ভার্চুয়াল রেস্টুরেন্ট চেইন।
- লাঞ্চলি: লগান পল ও কেএসআইয়ের সঙ্গে মিলে স্বাস্থ্যকর খাবারের প্যাকেজড কিট।
- বিস্ট গেমস: অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর সঙ্গে তৈরি গেম শো, যার পুরস্কার মূল্য ছিল $৫$ মিলিয়ন ডলার।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক নিষিদ্ধ হওয়ার গুঞ্জন ওঠে, তখন মিস্টারবিস্ট ঘোষণা দেন—তিনি নিজেই টিকটক কিনে ফেলবেন! তবে এই উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত জানা যায়নি।
মজার বিষয় হলো, কোটিপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি সমস্ত অর্থ পুনঃবিনিয়োগ করেন এবং সাধারণত কর্মীর মতোই মাসিক বেতন নেন। তিনি বলেন, “সম্পদ জমা করে রাখার কোনো পরিকল্পনাই আমার নেই।”
জিমি ডোনাল্ডসন আজ শুধু একজন ইউটিউবার নন; তিনি বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের আইডল, যিনি বিনোদনের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন মানবিকতা ও উদারতার বার্তা। তাঁর ভিডিও বিশ্বকে শেখায়—দানে আছে আনন্দ, আর সেই আনন্দেই আছে সাফল্য।
সংবাদসূত্র: বিবিসি, এনডিটিভি, রোলিং স্টোন।