বড় ধাক্কা! এবার ‘ORS’ নাম ব্যবহার নিষিদ্ধ করল ভারতের খাদ্য নিয়ামক সংস্থা FSSAI! কোন পানীয়গুলির উপর কোপ?

আর নয় বিভ্রান্তি! জনপ্রিয় ফলের রস এবং রেডি-টু-ড্রিঙ্ক পানীয়গুলির বোতলে এবার থেকে ব্যবহার করা যাবে না ‘ওআরএস’ (ORS) বা ওর্যাল রিহাইড্রেশন সলিউশন নামটি। এক যুগান্তকারী পদক্ষেপে ভারতের খাদ্য সুরক্ষা ও মান নিয়ামক সংস্থা (FSSAI) সমস্ত খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতকারক সংস্থাকে এই নির্দেশ জারি করেছে, যার ফলে একাধিক নামী সংস্থা বিপাকে পড়েছে।
নির্দেশিকায় কী বলা হয়েছে?
গত ১৪ অক্টোবর FSSAI একটি জরুরি নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছে, এখন থেকে কোনো খাদ্য বা পানীয়র নাম, লেবেল অথবা ট্রেডমার্কে ‘ORS’ শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না—তা সেটি উপসর্গ (Prefix) বা প্রত্যয় (Suffix) হিসাবে ব্যবহৃত হলেও।
এই নির্দেশের মাধ্যমে FSSAI অবিলম্বে তাদের পূর্ববর্তী সমস্ত অনুমতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এর আগে, ২০২২ সালের ১৪ জুলাই এবং ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারির নির্দেশে কিছু শর্তসাপেক্ষে, যেমন “এই পণ্যটি WHO অনুমোদিত ORS ফর্মুলা নয়” – এমন ডিসক্লেমার ব্যবহার করে FBO-দের (Food Business Operators) ‘ORS’ ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। নতুন নির্দেশিকায় সেই সব ছাড় সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে।
মিথ্যা লেবেলিং: কেন এই কড়া ব্যবস্থা?
নির্দেশ জারির পরের দিনই (১৫ অক্টোবর) FSSAI স্পষ্ট করে দেয়, ফ্রুট-বেসড (ফলভিত্তিক), নন-কার্বোনেটেড (কার্বনবিহীন) বা রেডি-টু-ড্রিঙ্ক—যে ধরনের পানীয়ই হোক না কেন, সেগুলিতে ‘ORS’ নাম ব্যবহার করা ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অ্যাক্ট, ২০০৬-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মতে, এই ধরনের লেবেলিংয়ের মাধ্যমে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। ‘মিথ্যা, প্রতারণামূলক, অস্পষ্ট এবং ভুল নাম বা লেবেল ঘোষণা’ আইনে একাধিক বিধিনিষেধ ভঙ্গ করছে।
নেপথ্যে ১০ বছরের লড়াই: এক শিশুবিশেষজ্ঞের PIL
FSSAI-এর এই বড় সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে হায়দরাবাদের শিশুবিশেষজ্ঞ ডাঃ শিবারঞ্জনী সন্তোষের প্রায় এক দশকের আইনি লড়াই। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাজারজাত করা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়গুলিকে ‘ORS’ হিসাবে ভুলভাবে বিপণন করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছিলেন।
২০২২ সালে তিনি তেলেঙ্গানা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করেন। তাঁর মূল অভিযোগ ছিল, বহু পানীয় নিজেদের ‘ORS’ দাবি করলেও সেগুলিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুমোদিত ইলেক্ট্রোলাইট এবং গ্লুকোজের নির্দিষ্ট মান বজায় রাখা হচ্ছে না। ডাঃ সন্তোষ আদালতকে জানান, এই ধরনের পানীয় বিশেষত শিশু এবং ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁর অভিযোগ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের কাছে পৌঁছানোর পরই বিষয়টি নজরদারির আওতায় আসে।
স্বাস্থ্য ঝুঁকি কোথায়?
WHO অনুমোদিত আসল ORS-এর মোট অসমোলারিটি (Total Osmolarity) থাকে ২৪৫ mOsm/L, যেখানে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইড এবং ডেক্সট্রোজের পরিমাণ থাকে সুনির্দিষ্ট। এর বিপরীতে, বাজারজাত অনেক ‘ORS’ দাবি করা পানীয়তে প্রতি লিটারে ১২০ গ্রাম পর্যন্ত চিনি থাকে, অথচ ইলেক্ট্রোলাইট থাকে নগণ্য পরিমাণে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পানীয় পান করলে উপকারের বদলে স্বাস্থ্যহানি হওয়ার ঝুঁকিই বেশি।
তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট এই জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়টি বিবেচনা করে FSSAI এবং ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অফ ইন্ডিয়াকে প্রতিক্রিয়া জানাতে নির্দেশ দেয়। আইনি পদক্ষেপের ফলস্বরূপ FSSAI অবশেষে এই কঠোর এবং ঐতিহাসিক নিষেধাজ্ঞা জারি করল।