‘নিজেকে সস্তা রাখো, দামি ভেবো না’, রঞ্জির আগে লক্ষ্মীরতন শুক্লর কোচিং দর্শন ও ‘স্বার্থপরতার’ মন্ত্র

বাংলার ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা যোদ্ধাদের মধ্যে অন্যতম, প্রাক্তন অলরাউন্ডার লক্ষ্মীরতন শুক্ল এখন বাংলার কোচ। বুধবার থেকে ঘরের মাঠে রঞ্জি ট্রফির (Ranji Trophy) অভিযান শুরু করছেন অভিমন্যু ঈশ্বরণরা। ইডেনে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির মাঝেই এবিপি লাইভ বাংলাকে এক একান্ত সাক্ষাৎকার দিলেন তিনি। তুলে ধরলেন বাংলার ক্রিকেট নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা এবং দলের নতুন দর্শন।
কোচিং সংস্কৃতি: ‘আমি জলও বয়ে নিয়ে যাই’
কোচিংয়ের গতানুগতিক ধারণায় বিশ্বাসী নন লক্ষ্মীরতন। তিনি নিজেকে কোচ নয়, ‘টিমম্যান’ হিসাবে দেখেন।
“আমি টিমম্যান হিসাবে কাজ করি। যখন খেলতাম, তখনও টিমম্যান ছিলাম। আমি দরকারে ছেলেদের বল থ্রো-ও করি, জল বয়ে নিয়ে যাই। এটাই আমাদের সংস্কৃতি। কোচ হিসাবে কোনওদিন চেয়ারে বসে কোচিং করাই না। কোচিং ব্যাপারটাকে ওইভাবে দেখিনি কোনওদিন।”
কোচ হিসাবে লক্ষ্য: কেন ‘স্বার্থপর’ হতে বললেন?
দলের ভালো করার আগে individual performance-এর উপর জোর দিচ্ছেন কোচ। আর সেই ভালো করার জন্য ক্রিকেটারদের ‘স্বার্থপর’ হওয়ার মন্ত্র দিচ্ছেন তিনি।
“আমি ওদের স্বার্থপর হতে বলি। কীরকম স্বার্থপর? ব্যাট করতে গিয়ে অফস্টাম্পের বাইরের বল খেলব না। বল করতে গিয়ে অফস্টাম্পের লাইনের বাইরে বল করব না। সেটা চেষ্টা করছি ছেলেদের শেখানোর। অনেকটা পেরেছি।”
নতুন মন্ত্র: ‘রুটি খাবে না পরোটা?’
শুক্লর মতে, সাফল্য লাভের একমাত্র বিকল্প পরিশ্রম ও সততা। নিজেকে অতিরিক্ত মূল্যবান মনে করা উচিত নয়। তিনি এক অভিনব উদাহরণ দিয়ে বোঝালেন তাঁর দর্শন।
“মৌসম্বীর রস দামি, ভিটামিন সি কম। তার চেয়ে আমলকি সস্তা, ভিটামিন সি বেশি। আমার দর্শনটাই হল, তুমি নিজেকে সস্তা রাখো, খুব দামি ভেবো না। নিজেকে বেশি মূল্যবান ভাবলে পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়ে। মাটিতে পা রেখে চলো।”
তিনি আরও যোগ করেন, “রুটি খাবে না পরোটা খাবে, সেটা তোমাকে বেছে নিতে হবে। যেদিন আমার দলের সবাই রুটিতে স্বচ্ছন্দ হবে, সেদিন দল হিসাবেও আমরা এগিয়ে যাব।”
রঞ্জিতে দুর্বল দল নেই, হার নিয়ে কড়া বার্তা
সহজ গ্রুপ নিয়ে কোনো আত্মতুষ্টিতে ভুগতে নারাজ লক্ষ্মীরতন। তিনি মনে করেন, এখন ঘরোয়া ক্রিকেটে কোনো দুর্বল দল নেই। মুস্তাক আলিতে অসমের কাছে অপ্রত্যাশিত হারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন:
“আজকের বিহার, ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরা, কেরলের সঙ্গে আগেকার দলের তুলনা করলে চলবে না। সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে আমরা মুম্বইকে হারালাম, পঞ্জাবকে হারালাম, অথচ কোয়ার্টার ফাইনালে অসমে শুধু রিয়ান পরাগ থাকলেও তাদের কাছে মোহালিতে হেরে গেলাম। ক্রিকেট তোলে, ক্রিকেটই নামায়।”
‘আমার দলে কোনো তারকা নেই’, হুঁশিয়ারি শামিকে
ভারতীয় দলের তারকা খেলোয়াড় মহম্মদ শামি (Mohammed Shami) এবং আকাশ দীপ দলে থাকা সত্ত্বেও উচ্ছ্বসিত নন লক্ষ্মীরতন। তিনি তারকা প্রথায় বিশ্বাস করেন না এবং দলের সবাইকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।
“ভারতীয় দলের তারকারা খেলছে বলে আমি খুশি, তবে উল্লসিত নই। আমার দলে কোনও তারকা নেই। তারকা প্রথায় আমি বিশ্বাস করি না। তোমাকে বাংলার হয়ে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে, পারফর্ম করতে হবে।”
দাদার বার্তা ও নতুন অধিনায়ক
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে (Sourav Ganguly) সকলের মেন্টর হিসেবে উল্লেখ করে লক্ষ্মীরতন জানান, সৌরভ ড্রেসিংরুমে এসে ছেলেদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
“দাদি ছেলেদের বলল, বল ছাড়তে হবে। উইকেট বুঝতে হবে। নিজের ব্যাটিং বুঝতে হবে। সময় দিতে হবে। এরকম চিন্তাভাবনা করে বলেই এরা গ্রেট… এ জন্যই দাদিকে ডাকলাম। বললাম, তুমি না বললে ছেলেদের আর কে বলবে?”
অভিমন্যু ঈশ্বরণ ফের অধিনায়ক হওয়ায় লক্ষ্মীরতন জানান, এই সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবে নেওয়া হয়েছে। তিনি অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান অনুষ্টুপ মজুমদারকে (Anustup Mazumder) বাংলার ক্রিকেটের দারুণ প্রাপ্তি বলে উল্লেখ করেন এবং তাঁর ব্যাটিং দলের ভরসা বলেও জানান।
নতুন কোচিং দর্শন আর তারকারা দলে থাকা সত্ত্বেও ‘জিরো থেকে শুরু’ করার এই মানসিকতা বাংলা দলকে এবার রঞ্জি ট্রফিতে কতদূর নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার।