আইন নয়, মানবিকতাই বড়! সারোগেসিতে বয়সসীমার বাঁধন ভাঙল সুপ্রিম কোর্ট, বিরাট স্বস্তি সেইসব দম্পতিদের

আইন ও যুক্তির দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত মানবিকতার পক্ষেই রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বৃহস্পতিবার স্পষ্ট জানিয়েছে যে, যে সমস্ত দম্পতি নতুন সারোগেসি আইন (২০২১) কার্যকর হওয়ার আগেই ভ্রূণ সংরক্ষণ করেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য নতুন আইনের বয়সসীমা প্রযোজ্য হবে না। বিচারপতি বিভি নাগারত্না ও কেভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চের এই রায়কে জীবনের মৌলিক অধিকারের পক্ষে একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কেন এই যুগান্তকারী রায়?
বিচারপতিরা বলেন, “কোনও আইনই অতীতে গিয়ে মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।” যদি তা করতে হয়, তবে আইনেই তার স্পষ্ট উল্লেখ থাকা চাই।

২০২১ সালের সারোগেসি (রেগুলেশন) আইন, যা ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়, তাতে বলা হয়েছিল—সারোগেসির মাধ্যমে মা-বাবা হতে গেলে মহিলার বয়স হতে হবে ২৩ থেকে ৫০-এর মধ্যে এবং পুরুষের বয়স হতে হবে ২৬ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে। সরকারের যুক্তি ছিল, সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি যত্নের জন্য এই বয়সসীমা জরুরি।

কিন্তু তিনটি দম্পতি এই আইন কার্যকর হওয়ার আগেই সারোগেসি প্রক্রিয়া শুরু করে ভ্রূণ সংরক্ষণ সম্পন্ন করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, তাঁরা যদি আগে জানতেন এমন আইন আসছে, তবে ভ্রূণ স্থানান্তরের কাজটি আগেই শেষ করে নিতেন।

এই প্রসঙ্গে বিচারপতিরা বলেন, সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান লাভের অধিকার সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত, যা জীবনের মৌলিক অধিকার। এটিকে কেবল সময় বা বয়সের সীমায় আটকে রাখা যায় না। এই দম্পতিরা যখন প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, তখন তাঁদের ওপর কোনো বয়সসীমা ছিল না, তাই নতুন আইন পিছনে ফিরে গিয়ে তাঁদের সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।

তাঁরা আরও বলেন, সন্তানলাভের আকাঙ্ক্ষা এক গভীর মানবিক ইচ্ছা, যা কেবল সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। আদালত মনে করিয়ে দেয়, আইন সাধারণত ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য, অতীতের জন্য নয়।

সুপ্রিম কোর্টের মতে, এই রায়ের সুফল পাবেন সেইসব দম্পতিরা যাঁরা সারোগেসি প্রক্রিয়ার ‘স্টেজ বি’-তে ছিলেন। অর্থাৎ, যাঁদের গ্যামেট সংগ্রহের পর ভ্রূণ তৈরি ও সংরক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে এবং ঠিক তখনই আইন কার্যকর হয়েছে, তাঁরা নতুন নিয়মের বাইরে বেরিয়েই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন।

তবে আদালত উল্লেখ করেছে, যাঁরা শুধু কাউন্সেলিং করিয়েছেন, অনুমোদন বা শংসাপত্র পেয়েছেন, অথবা গ্যামেট সংগ্রহের পর্যায়ে ছিলেন, তাঁরা এই রায়ের আওতায় আসবেন না।

আদালত নির্দেশ দিয়েছে, মামলাকারী দম্পতিরা আইনের অন্য শর্ত পূরণ করলে সারোগেসি প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারবেন। তাঁদের আর বয়স যাচাইয়ের সার্টিফিকেট লাগবে না। আদালত আরও জানিয়েছে, অন্য দম্পতিরা যদি একই সমস্যায় পড়েন, তাঁরা হাইকোর্টে আবেদন করতে পারেন। এই রায় মনে করিয়ে দিল—মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের অধিকার শুধু শরীরের নয়, হৃদয়েরও বিষয়।