বিহারে প্রতিটি পরিবারকে সরকারি চাকরি? তেজস্বীর মেগা প্রতিশ্রুতি কি আসলে ‘অর্থনৈতিক আত্মহত্যার’ বীজ?

বিহারের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি)-এর নেতা তেজস্বী যাদব বৃহস্পতিবার তাঁর সাংবাদিক সম্মেলনে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সরকার গঠিত হলে প্রতিটি বিহারি পরিবারকে একটি করে সরকারি চাকরি দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ, এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করার অর্থ বিহারের রাজকোষে চরম আঘাত হানা। তবে এটিকে আসন্ন নির্বাচন দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি সুচিন্তিত ও পরিমাপিত রাজনীতি বলেই মনে হচ্ছে।
নিউজ১৮-এর পক্ষ থেকে বিহারের রাজ্য বাজেট, রাজস্ব উত্পাদন ক্ষমতা, সিএজি রিপোর্ট (মার্চ ২০২৫), নতুন নীতি আয়োগ মূল্যায়ন রিপোর্ট এবং সরকারের জাতিগত জনগণনা রিপোর্ট-সহ সরকারি তথ্য ও নথিগুলির নিবিড় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যাদবের এই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিটি স্রেফ একটি আড়ম্বরপূর্ণ ঘোষণা, যার হিসাব-নিকাশ বাস্তবতার মুখোমুখি হলেই ভেঙে পড়ে।
সাম্প্রতিক রাজ্য-স্তরের অনুমান অনুযায়ী, বিহারের জনসংখ্যা প্রায় ১২৭ মিলিয়ন (২০২৫ সালের অনুমান) এবং রাজ্যের গড় পরিবারের আকার প্রায় ৫.৪ জন, যার অর্থ প্রায় ২ কোটি ৩৫ লক্ষ (২৩.৫ মিলিয়ন) পরিবার। বর্তমানে, বিহারের জাতিগত সমীক্ষা অনুসারে, প্রায় ২০.৫ লক্ষ মানুষ সরকারি চাকরিতে রয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১.৫৭%। এই সরকারি কর্মচারীদের জন্য রাজ্য ইতিমধ্যেই কোষাগার থেকে খরচ করছে।
তেজস্বীর প্রতিশ্রুতির লক্ষ্য হলো প্রতিটি পরিবারকে একটি করে চাকরি দেওয়া, অর্থাৎ রাজ্যের ২.৩৫ কোটি চাকরির জন্য বেতন দিতে হবে। বর্তমান ২০ লক্ষ চাকরি বাদ দিলে, রাজ্যকে ২.১৫ কোটি নতুন চাকরি তৈরি করতে হবে।
বিহারের রাজ্য অ্যাকাউন্টগুলির সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যের বার্ষিক বেতন বা মজুরি খরচ ৪৫,০০০ কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ, বর্তমানে প্রতি সরকারি কর্মচারীর গড় বার্ষিক বেতন খরচ প্রায় ২.২ লক্ষ টাকা। এই আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি বিহারি পরিবারকে একটি সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
বাস্তবতার পরিহাস
যে রাজ্যে সরকারি চাকরি এখনও স্থিতিশীলতা এবং সম্মানের প্রতীক, সেখানে এই প্রতিশ্রুতি সম্মানের আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগায়। তবে এর পেছনের অঙ্ক বাস্তবতাকে উপহাস করে। তেজস্বী তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে মূলত ২.১৫ কোটি অতিরিক্ত সরকারি চাকরি তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যা বর্তমান কর্মীবাহিনী থেকে দশ গুণেরও বেশি। এমনকি, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের ১২ লক্ষ চাকরির পূর্বের প্রতিশ্রুতিও অবাস্তব বলে উপহাসের শিকার হয়েছিল। এই নতুন প্রতিশ্রুতি কল্পনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে, যা অর্থনৈতিক আত্ম-ধ্বংসের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।
২০২৫-২৬ সালের বাজেটে বিহারের প্রায় ২০ লক্ষ কর্মচারীর বেতন ও মজুরিতে প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ কোটি টাকা খরচ হওয়ার অনুমান করা হয়েছে। তেজস্বীর প্রতিশ্রুতির অধীনে ২.১৫ কোটি নতুন কর্মচারীর চাহিদা ধরলে, এই অঙ্কটি বার্ষিক প্রায় ৪.৬ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
২০২৪-২৫ সালের বিহার বাজেটের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী অনুসারে, রাজ্য দ্বারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ব্যয়ে ৯২,৮৮২ কোটি টাকা খরচ হওয়ার অনুমান করা হয়েছে, যা এর আনুমানিক রাজস্ব প্রাপ্তির ৪১%। এটি বেতন (রাজস্ব প্রাপ্তির ১৮%), পেনশন (১৪%) এবং সুদ পরিশোধ (৯%)-এর মতো খরচগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে।
যদি এই পরিসংখ্যানটি বিবেচনা করা হয়, তবে ২০২৫-২৬ সালের জন্য বিহারের মোট রাজস্ব ব্যয় (যেখানে বেতন, পেনশন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কল্যাণ সবকিছু অন্তর্ভুক্ত) প্রায় ২.৫ লক্ষ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বেতন বিলটি একাই রাজ্যের পুরো বাজেটের প্রায় দ্বিগুণ হবে। এটি অনেকটা “স্কুটারের ঋণে জম্বো জেট কেনার” প্রতিশ্রুতির মতো।
পেনশন, প্রশাসনিক খরচ এবং নিয়োগের খরচ যোগ করলে এই রাজকোষের গণিতটি কেবল বিগড়ায় না, একেবারে ভেঙে পড়ে। সিএজি (মার্চ ২০২৫) রিপোর্ট বিহারের ক্রমবর্ধমান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ব্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করে সতর্ক করেছে যে, রাজ্যের ৭০%-এর বেশি রাজস্ব প্রাপ্তি বেতন, পেনশন এবং সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে।
নীতি আয়োগ বিহারের জন্য তার নতুন রিপোর্টে মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে রাজ্যটিকে সবচেয়ে নিচের স্থানে রেখেছে, যা প্রমাণ করে যে নতুন করে এত বড় আর্থিক বোঝা বহন করার ক্ষমতা রাজ্যের নেই। রিপোর্টে বলা হয়েছে, “২০২২-২৩ সাল পর্যন্ত, বিহারের বার্ষিক বেকারত্বের হার ৩.৯ শতাংশ, যা জাতীয় গড় ৩.২ শতাংশের চেয়ে সামান্য বেশি।”
তেজস্বীর এই ঘোষণাটি প্রশংসা কুড়ানোর জন্য, অডিটের জন্য নয়। এটি একধরনের বিপজ্জনক প্রত্যাশা তৈরি করে এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করে। ‘প্রতি পরিবারে চাকরি’ একটি স্লোগান নয়, বরং একটি কাঠামোগত বোঝা, যা বিহারকে স্থায়ী আর্থিক সংকটে ফেলতে পারে।