ইট কেটে তৈরি মা দুর্গা, মণ্ডপে ‘ভগবানের আদালত’! কলকাতার যে ৪ পুজোয় এবছর ভিড় উপচে পড়বেই

আর মাত্র ক’দিনের অপেক্ষা। এরপরই শুরু হয়ে যাবে বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। উত্তর থেকে দক্ষিণ, কলকাতার পুজো মণ্ডপগুলি এবার থিমের অভিনবত্বে একে অপরকে ছাপিয়ে গিয়েছে। ক্লাব কর্তারা এবার মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড় নিয়ে দারুণ আশাবাদী। এই বছর শহরের অন্যতম সেরা চারটি মণ্ডপের বিস্তারিত খোঁজ রইল।
১. গৌরিবেড়িয়া সর্বজনীন: ইট কেটে তৈরি দুর্গা প্রতিমা ও ‘মাটি ও জীবন’
গৌরিবেড়িয়া সর্বজনীন দুর্গোৎসব এই বছর ৯২তম বর্ষে পা দিল। শিল্পী নিখিল মিস্ত্রির ভাবনায় এবারের থিম ‘মাটি ও জীবন’।
বিশেষ আকর্ষণ: ৬০ হাজারেরও বেশি বিশেষভাবে তৈরি ছাঁচের ইট দিয়ে গোটা মণ্ডপ তৈরি হয়েছে।
প্রতিমা: প্রায় ৫ হাজার ইট দিয়ে তৈরি গম্বুজ কেটে কেটে তৈরি হয়েছে দেবী দুর্গার মূর্তি। এটি টেরাকোটার আদলে তৈরি, যেখানে বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে।
শিল্পী বার্তা: শিল্পী নিখিল মিস্ত্রি মণ্ডপের মাধ্যমে ভূখণ্ড দখলের লড়াই বন্ধ করার এবং বিশ্বশান্তির বার্তা দিয়েছেন। মণ্ডপে প্রবেশের মুখে রয়েছে একটি বিশাল নৌকা, যা জীবন প্রবাহের প্রতীক।
২. সমাজসেবী সংঘ: ১৯৪৬-এর দাঙ্গা ও মানুষের সেবার ৮০ বছর
দক্ষিণ কলকাতার এই পুজোটি এবার ৮০তম বর্ষে নিজেদের পথচলাকেই থিম হিসেবে তুলে ধরেছে। শিল্পী প্রদীপ পাল-এর মণ্ডপে ফুটে উঠেছে ক্লাবের শুরুর দিনগুলির কাহিনি।
থিম: ১৯৪৬ সালের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-র ভয়াবহ অস্থিরতার সময়ে কয়েকজন তরুণ কীভাবে নীরবে মানুষের সেবা শুরু করেছিলেন, সেই স্মৃতি মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ইতিহাস: লেক ভিউ রোডের এই ক্লাবটি রক্তপাত ও ধ্বংসের মাঝে অসহায়দের খাবার, আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়েছিল। কীভাবে সহিংসতার ছায়ায় অনুষ্ঠিত একটি দুর্গাপুজো ৮০ বছর ধরে টিকে থাকার প্রতীকে পরিণত হলো, সেটাই এইবারের মূল গল্প।
ক্লাব কর্তার বার্তা: ক্লাব কর্তা অরিজিৎ মৈত্র জানান, লীলা রায়, অনিল রায়, শরৎ বোসের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অনুপ্রেরণায় বিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই সমস্ত কর্মকাণ্ড মণ্ডপে তুলে ধরা হয়েছে।
৩. বাদামতলা আষাঢ় সংঘ: ‘আর্জি দ্যা প্রেয়ার’ (ভগবানের আদালত)
বাদামতলা আষাঢ় সংঘ তাদের ৮৮তম বর্ষে নিয়ে এসেছে অন্যরকম এক ভাবনা— ‘আর্জি দ্যা প্রেয়ার’।
থিম: শিল্পী সোমনাথ দোলুইয়ের শিল্পকর্মে ফুটে উঠেছে ‘ভগবানের আদালত’। যেখানে দেবী দুর্গা কেবল শক্তিরূপা নন, তিনি ন্যায়ের প্রতিমূর্তি।
মণ্ডপসজ্জা: মণ্ডপ সজ্জিত হয়েছে বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রতীক দিয়ে— ন্যায়দণ্ডের প্রতিরূপ, সুবিচারের প্রতীকী চিত্রায়ণ এবং বিচার সংক্রান্ত সাংকেতিকতা। মণ্ডপে খাঁচায় বন্দি এক মানব মূর্তিও থাকছে।
বার্তা: ক্লাব কর্তাদের আর্জি, মা দুর্গা যেন সকল অশুভকে পরাজিত করে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন এবং শান্তি বজায় রাখেন।
৪. বেলেঘাটা ৩৩ পল্লি: ‘তিন, তিন, শর্ত তিন’ (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান)
বেলেঘাটা ৩৩ নম্বর পল্লীবাসীবৃন্দ তাদের রজত জয়ন্তী (২৫তম বর্ষে) এই বছর তুলে ধরেছে মানুষের জীবনের তিন মৌলিক চাহিদা।
থিম: ‘তিন, তিন, শর্ত তিন’— অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান।
বিশেষ আকর্ষণ: এই মণ্ডপের সবচেয়ে বড় পাওনা হলেন পদ্মশ্রী শিল্পী গণেশ হালুই। ৯০ বছর বয়সে এসে তিনি এই মণ্ডপের মাতৃপ্রতিমার নকশা এঁকেছেন।
সজ্জা: শিল্পী শিবশঙ্কর দাসের মণ্ডপে শিপিং মলের ট্রলি, চাল ডালের বস্তা, শস্য ভাণ্ডার এবং প্লাই বোর্ডে আঁকা বাড়ির ছবি ব্যবহার করে এই তিনটি মৌলিক চাহিদাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ক্লাব সদস্যের মন্তব্য: ক্লাব সদস্য স্বাতী সাহা জানান, পদ্মশ্রী শিল্পী গণেশ হালুই-এর হাতে আঁকা নকশা শুধু প্রতিমাতে নয়, ঠাকুরঘরের সজ্জাতেও তাঁর চিন্তাভাবনার বাস্তবায়ন হয়েছে।
এই চারটি থিমই প্রমাণ করে যে, দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি শিল্প, সমাজ ও দর্শনের এক বিশাল প্রদর্শনীর মঞ্চ। এবার শুধু অপেক্ষা— কোন মণ্ডপ দর্শকমহলে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে।