‘উত্তমদা বেঁচে থাকতে’, মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মদিনে যা বললেন সাবিত্রী?

আজ ৩ সেপ্টেম্বর, বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমারের শততম জন্মবার্ষিকী। ১০০ বছর পরেও তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। এই বিশেষ দিনে কিংবদন্তি অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রিয় “উত্তমদা”-কে নিয়ে কথা বললেন, যেখানে তার কণ্ঠে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং অভিমানের সুর মিশে ছিল।

উত্তম-সাবিত্রী জুটির রসায়ন
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় একজন এমন অভিনেত্রী ছিলেন, যাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে অভিনয় করতে নাকি উত্তমকুমারও ভয় পেতেন। উত্তম-সুচিত্রা জুটির মতোই, উত্তম-সাবিত্রী জুটিও বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে খুব প্রিয় ছিল। এই জুটির অভিনীত বহু জনপ্রিয় ছবি আজও দর্শকদের মনে উজ্জ্বল। যদিও তাঁদের দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে শোনা যায়, সাবিত্রী কখনও উত্তমকুমারকে নিজের করে পেতে চাননি। নিজের জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি একাকী কাটিয়েছেন।

‘শ্যামলী’ নাটকের স্মৃতি
উত্তমকুমারের সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময় হিসেবে সাবিত্রী ‘শ্যামলী’ নাটকের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “‘শ্যামলী’ আমার জীবনের একদিকে যেমন সব স্বপ্ন পূরণ করেছে, তেমনি একদিকে আমার সব স্বপ্ন কেড়েও নিয়েছে। যখন উত্তমকুমার এই নাটকে অভিনয় করতে আসেন, তখন অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন যে সিনেমার একজন অভিনেতা মঞ্চে কতটা সফল হবেন। কিন্তু ‘শ্যামলী’ প্রমাণ করে দিয়েছিল যে উত্তমকুমার মঞ্চেও একজন সফল শিল্পী।”

অভিমানী কণ্ঠস্বরে মূল্যায়ন
উত্তমকুমারের পরোপকারী স্বভাবের কথা বলতে গিয়ে সাবিত্রীর কণ্ঠে অভিমানের সুর শোনা যায়। তিনি বলেন, “উত্তমকুমার খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি হয়তো সবাইকে সাহায্য করতেন, কিন্তু আমি তাঁর কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাইনি। তার সঙ্গে অভিনয় করতে আমার ভালো লাগত, এটাই বড় কথা। তিনি এমনিতেই মহানায়ক হননি; আমরা সবাই তার এই যাত্রার অংশ ছিলাম।” সাবিত্রী জানান যে, তিনি নিশ্চিত নন যে উত্তমকুমার তার জীবদ্দশায় ‘মহানায়ক’ উপাধিটি দেখে যেতে পেরেছিলেন কিনা।

প্রিয় ছবি ও জীবনের প্রতিচ্ছবি
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় তার অভিনীত সেরা চরিত্র বেছে নিতে পারেননি, তবে উত্তমকুমারের সঙ্গে করা কিছু ছবিকে তার মনের খুব কাছের বলে উল্লেখ করেন, যেমন ‘নিশিপদ্ম’, ‘মঞ্জরী অপেরা’, এবং ‘উত্তরায়ণ’।

বিশেষ করে ‘উত্তরায়ণ’ ছবির কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এই ছবিতে তার ‘সতী’ চরিত্রটি ছোট হলেও এর গভীরতা ছিল অসাধারণ। ছবির একটি সংলাপে সতী চরিত্রটি উত্তমকুমারকে বলেছিল, “‘সতী সতী, সতী রতি নয়। আমাদের কায়ার কোনো সম্পর্ক থাকবে না আর সব থাকবে। তুমি হলে আমার ভগবান, পুরুষোত্তমের প্রতিনিধি।’ ” সাবিত্রী মনে করেন, এই সংলাপটি তার নিজের একাকী জীবন ও যৌবনের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি বলেন, “আমি ওই চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম।”

শেষ বিদায় ও অপূর্ণ স্বীকৃতি
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তমকুমারের মৃত্যুর খবর পেয়ে সাবিত্রীও অন্যদের মতো দুঃখ পেয়েছিলেন। তিনি তার নায়ককে শেষ বিদায় জানাতে তার গিরিশ মুখার্জী রোডের বাড়িতে গিয়েছিলেন।

জীবদ্দশায় একজন শিল্পীর স্বীকৃতি পাওয়ার প্রসঙ্গে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বলেন, “আমাদের দেশে বেঁচে থাকতে শিল্পীরা স্বীকৃতি পায় না। উত্তমকুমার নিজে বন্ধুদের নিয়ে জন্মদিন পালন করতেন। কিন্তু সরকার তাঁকে ‘মহানায়ক’ উপাধি দেওয়ার পর তার জন্মদিন কোনো দিন সরকারের পক্ষ থেকে উদযাপিত হয়েছে কিনা, আমার মনে নেই।”