বিশেষ: অফিসের কাজ নিয়ে খুব চাপ, জেনেনিন সময়মতো কাজ শেষ করার সেরা ৫ উপায়

ঢিলেমি, কাজ ফেলে রাখা বা দীর্ঘসূত্রিতা শুধু একটি বদ অভ্যাসই নয়, এটি একটি অভিশাপ।
আপনি যদি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সময়ের কাজ সময়ে করতে না পারেন, কাজ ফেলে রেখে রেখে একদম শেষ সময় পর্যন্ত নিয়ে আসেন; এবং সামান্য সময়ে অনেক কাজ করতে বাধ্য হন – তবে আপনার মাঝে ঢিলেমির সমস্যা আছে। তবে এই অভিশাপ একমাত্র আপনার ঘাড়ে নয়, পৃথিবীর ২০% মানুষই এই অভিশাপের শিকার।
হাতে জরুরী কাজ থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের মানুষেরা অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।একদম শেষ সময়ে গিয়ে এদের টনক নড়ে – আর তখন নাকেমুখে কোনওরকমে কাজটি তারা শেষ করে। অনেক সময়ে কাজ শেষও করতে পারে না।
কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ঢিলেমি বা দীর্ঘসূত্রিতা করা মানুষের জন্য যেমন কিছু নির্দিষ্ট সমাধান রয়েছে, তেমনি এমন কিছু বিষয় আছে যেগুলো চর্চা করলে সব ধরনের ঢিলেমি করা মানুষই উপকার পাবেন। এমনই ৫টি বিষয় দেখে নেয়া যাক:
০১. পরিকল্পনামাফিক ব্রেক নিন:
আলাদা আলাদা পাঁচ প্রকারের ঢিলেমি রুগীর ব্যাপারে পড়তে গিয়ে কিছু বিষয়ে মিল নিশ্চই আপনার নজরে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম মিল হলো, এরা কেউ সময়ের সদ্ব্যবহার করে না। আসলে এটাই এই রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এরা সবাই বিভিন্ন অজুহাতে কাজ ফেলে রেখে সময় নষ্ট করে। বিভিন্ন কারণে এদের সময়মত কাজ করতে অনীহা সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে প্রধান একটি কারণ কাজে একঘেয়েমি ধরে যাওয়ার কারণে মনযোগ রাখতে না পারা।
সত্যি কথা বলতে, মানুষের মস্তিষ্ক আসলে একই কাজ দীর্ঘ সময় একটানা করে যাওয়ার উপযুক্তই নয়। বিশেষ করে সেই কাজে যদি প্রতিনিয়ত বুদ্ধি খাটাতে হয় (নিশ্চই বুঝতে পারছেন, কিছু মানুষের পড়াশুনা করতে এত সমস্যা কেন হয়?)। মানুষের মস্তিষ্ক খুব সহজেই বোর হয়ে যায়। আর এটা হতে পারে কাজ ফেলে রাখার প্রধান একটি কারণ।
সমাধান? – নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিকল্পনা মাফিক বিরতি নেয়া। একটি নির্দিষ্ট সময় কাজ করার পর আবার নির্দিষ্ট সময়ের ব্রেক নিলে মস্তিষ্ক মনে করে যে নতুন করে সে কিছু শুরু করছে – এই কারণে সে সহজে একঘেয়েমিতে ভোগে না।
সিনেমা বা গল্পের বইয়ের শুরু এবং শেষটা আমরা সবচেয়ে বেশি মনে রাখতে পারি কারণ কোনকিছুর শুরু এবং শেষে আমাদের মনযোগ সবচেয়ে ভালো থাকে। কাজেই যে কোনও বড় কাজকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে ভাগগুলোর মাঝখানে ছোট ছোট ব্রেক দিলে কাজের প্রতি মনযোগ অনেকটাই বেড়ে যায়।
অনেকেই বোর হবার ভয়ে কাজ শুরুই করতে পারে না। এই পদ্ধতি প্রাকটিস করলে কাজের মাঝে বোর হওয়ার পরিমান অনেক কমে যাবে – এর ফলে তাদের কাজের প্রতি আগ্রহও বাড়বে, এবং কাজ ফেলে রাখার মাত্রা কমবে।
এই ক্ষেত্রে আপনি পমোডরো টাইমার (pomodoro timer) ব্যবহার করতে পারেন। গুগল প্লে স্টোরে সার্চ করলেই দুইশ’র বেশি এ্যাপ পাবেন। এছাড়া কম্পিউটারের জন্যও Focus 10 এ্যাপ্লিকেশনটি ভালো। গুগুলে “free pomodoro timer windows 10” লিখে সার্চ দিলে প্রথম যে লিংকটি আসবে, সেখান থেকেই Focus 10 ডাউনলোড করতে পারবেন। এই টাইমারে প্রতি ২৫ মিনিট পর পর ৫ মিনিটের ব্রেক থাকে। প্রতি ২৫ মিনিট সেশনের পর এলার্ম বাজে। এই টাইমার ব্যবহার করলেই বুঝতে পারবেন ফোকাস রাখা আসলে কতটা সহজ।
০২. নিজেকে পুরস্কৃত করুন অথবা শাস্তি দিন:
কোনওকিছু অর্জন করলে যে তার পুরস্কার অন্য কারও থেকে পেতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। আপনি নিজেও নিজেকে পুরস্কৃত করতে পারেন। এটা করলে আপনার কাজের স্পৃহাও বাড়বে।
ধরা যাক, আপনার হাতে একটি কাজ করার জন্য ৭দিন সময় আছে। আপনি নিজেকে বললেন যে কাজটি পাঁচ দিনে শেষ করতে পারলে বাকি দুই দিন আপনার প্রিয় খাবার বিরিয়ানী খেয়ে কাটাবেন।
আর যদি তা না হয় তবে, আগামী এক মাসে বিরিয়ানী খাবেন না। হাস্যকর মনে হলেও, এই খাবারের তাগিদেই আপনার কাজের গতি বেড়ে যাবে। চাইলে বিরিয়ানীর ছবি সামনে লটকে রাখতে পারেন। এতে দারুন ভাবে আপনার কাজের আগ্রহ বাড়বে। সময় নষ্ট করতে মন চাইবে না। এভাবে প্রতিটি কাজের ছোট ছোট ভাগের জন্য ছোট ছোট পুরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে পারেন।
অনেক কোম্পানীই কিন্তু তাদের কর্মীদের এভাবে উদ্দীপনা দিয়ে থাকে। সময়ের আগে সেলস টার্গেট পূরণ করতে পারলে বাড়তি বোনাস, সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারলে তারচেয়ে একটু কম, আর না পারলে কোনও বোনাস হবে না – এটা আপনি নিজেই নিজের বস হয়েও করতে পারেন। ব্যাপারটা নিজের ওপর প্রয়োগ করলে নিজের পরিবর্তন দেখে নিজেই অবাক হয়ে যেতে পারেন।
০৪. সময়ের হিসাব রাখুন:
অনেক সময়ে ঢিলেমি করতে করতে কতটা সময় আমরা নষ্ট করছি, তা বুঝতে না পারার কারণে আমরা ঢিলেমি বন্ধ করতে পারি না।
আপনি যদি দেখতে পান যে, কাজের পেছনে আপনি দিনের মাত্র ২০ ভাগ সময় ব্যয় করছেন, আর ঢিলেমি করে বাকি ৬০ ভাগ নষ্ট করছেন – তবে আপনার টনক নড়তে বাধ্য। অনেক সময়ে আমরা চেয়ার টেবিলে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকি কিন্তু পড়াশুনা বা কাজ হয় খুব কম সময়ের। কিন্তু সেই সময় কতটা – তা বুঝতে না পারায় আমরা এটা নিয়ে সচেতন হতে পারি না।
কোথায় কতটা সময় খরচ হচ্ছে – এটা বুঝতে পারলে আপনার পক্ষে নিজের অভ্যাসের পরিবর্তন করা, ও ঠিক কোথায় পরিবর্তন আনতে হবে – তা বুঝতে পারা অনেক সহজ হয়ে যায়।
একথা সত্যি যে, প্রতিটি মিনিটের হিসেব রাখা অসম্ভবের কাছাকাছি একটি ব্যাপার, কিন্তু মিনিট না হলেও ঘন্টার হিসেব রাখাই যায়। আপনি যখন কোনও কাজ শুরু করলেন – তখন হাতে কলমে সেই কাজ কখন শুরু করছেন সেটা কাগজে লিখুন। কাজ করতে করতে যদি অন্যকিছুতে মনযোগ চলে যায় – সেই সময়টিও কাগজে লিখুন, আবার কাজে ফিরে আসার সময়টি কাগজে লিখুন। এভাবে প্রতিবার কাজে মনযোগ দেয়ার সময়ে তখন কয়টা বাজে – এটি লিখে রাখলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন, ঠিক কতটা সময় আপনি আসলেই কাজ করছেন।
এতে আরেকটি উপকার হবে; আপনি আপনার মনযোগের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠবেন। যখনই মনযোগ অন্যদিকে যাবে, বা আপনি কাজ ফেলে অন্য কোথাও যাবেন – আপনার মনের একটা দিক সব সময়ে কাজের ব্যাপারে সচেতন থাকবে।
যেহেতু আমরা অনেক সময়ে অচেতন ভাবেই কাজ ফেলে সময় নষ্ট করি, সেহেতু এই সচেতন থাকাটা সময় নষ্টের মাত্রা অনেক কমিয়ে আনবে।
০৫. অভ্যাস ফিরে আসা থামান:
সবকিছুর পর দীর্ঘসূত্রিতা বা ঢিলেমি আসলে একটি বদ অভ্যাস। আর অভ্যাসের একটি বদ অভ্যাস হলো চলে গিয়েও ফিরে ফিরে আসা। একটি বদ অভ্যাস হয়তো ত্যাগ করে কিছুদিন ভালো থাকলেন, কোনও না কোনও ছুতোয় সে ফিরে এসে আবার ঘাঁটি গেড়ে বসবে। আর এই ফিরে আসাকে থামানোটা অভ্যাস দূর করার চেয়েও জরুরী।
কাজেই বদ অভ্যাস ত্যাগ করার পর সেটা যেন আবার ফিরে না আসে সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে।
এই কড়া নজর রাখার সময়ে মনে রাখতে হবে, বদ অভ্যাস অনেক সময়ে ছদ্মবেশ ধরে আক্রমণ করে। যেমন ধরুন, আপনার দীর্ঘসূত্রিতার হাতিয়ার ছিলো সারাদিন সিরিয়াল দেখা। সেটা বাদ দিয়ে কয়দিন সময়ের কাজ সময়ে করছিলেন, আবার হঠাৎ করে সিনেমা দেখার প্রতি আপনার ঝোঁক অনেক বেড়ে গেছে। আপনার মন আপনাকে বলবে – আপনি আগের মত সময় নষ্ট করছেন না। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, এটা চা ছেড়ে কফি ধরার মত। চা হোক, কফি হোক – মূল ব্যাপারটা কিন্তু ক্যাফেইন। কাজেই চা ছাড়তে চাইলে বেশি করে পানি খান, কফি খেলে সেই একই ব্যপার ঘটবে। সিগারেট ছাড়তে চাইলে সিগারেট ছাড়ুন, ব্র্যান্ড বদলাবেন না। আর এটা আপনি করছেন কিনা – সেদিকে কড়া নজর অবশ্যই রাখুন।
অভ্যাস একদিনে বদলানো যায় না, একে ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে বদলাতে হয়। কাজেই, একবারে না বদলে কৌশল অবলম্বন করে বদলান। এবং এটা যেন ফিরে না আসে সেদিকে খেয়াল রাখুন।
পরিশিষ্ট:
এত বড় একটি লেখা পড়ার পর খুব বড় উপসংহার টানার প্রয়োজন মনে করছি না। শুধু এটুকু বলতে চাই, মানুষ চাইলে পারেনা এমন কিছু নেই। সৃষ্টিকর্তা শুধু শুধু মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব করেননি। নিজের আদিম প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণের বুদ্ধি ও ক্ষমতা তিনি মানুষকে দিয়েছেন।
দীর্ঘসূত্রিতা বা ঢিলেমিকে নিয়ন্ত্রণ করা আপাতদৃষ্টিতে যতই কঠিন মনে হোক না কেন, আপনি চাইলে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারবেন। এই একটি মাত্র স্বভাবকে জয় করতে পারলে নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব, যা সাধারনভাবে হয়তো কল্পনাও করা যায় না। আর সেই পথে যদি এই লেখাটি আপনার বিন্দুমাত্র উপকারেও আসে – তাহলেই আমাদের প্রচেষ্টা সফল বলে মনে করবো।