শিক্ষকের মারের ‘বদলা’ নিতে পিস্তল নিয়ে স্কুলে ছাত্র, খবর ছড়াতেই ছড়ালো চাঞ্চল্য

‘বাপ কা বেটা’— এই প্রবাদ বাক্যটি যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়ে ধরা পড়েছে ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুরে। শিক্ষকের হাতে থাপ্পড় খাওয়ার প্রতিশোধ নিতে দশম শ্রেণির এক ছাত্র রীতিমতো পিস্তল নিয়ে স্কুলে হাজির হয়েছিল, যা নিয়ে গোটা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার ঘটা এই ঘটনার পর অভিযুক্ত ছাত্রটিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। জানা গেছে, পিস্তলটি ছিল লোডেড এবং ম্যাগাজিনে দুটি গুলিও ছিল।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ওই নাবালক ছাত্রটির বাবা স্থানীয় তৃণমূল নেতা। নাইন এমএম পিস্তলটি তাঁরই বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনার পর থেকে ওই নেতা পলাতক। ঝাড়গ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেড কোয়ার্টার) সৈয়দ মহম্মদ মামদুল্লাহ হাসান জানান, “পিস্তলটি বেআইনি এবং উন্নত মানের। ছাত্রের পলাতক বাবার খোঁজ চলছে। তাঁকে গ্রেফতার করা গেলে বোঝা যাবে তিনি কোথা থেকে এই অস্ত্র পেয়েছেন।” পুলিশ আরও জানতে পেরেছে যে ছাত্রের দুই কাকার মধ্যে একজন এনভিএফ কর্মী এবং আরেকজন জুনিয়র কনস্টেবল পদে কর্মরত।

পুলিশের দাবি, ছাত্রটি তার ইতিহাসের শিক্ষককে গুলি করার উদ্দেশ্যেই পিস্তল নিয়ে গিয়েছিল। তবে অন্য ছাত্ররা তাকে পিছন থেকে জাপটে ধরলে ধাক্কাধাক্কিতে ম্যাগাজিনটি মাটিতে পড়ে যায়। এর ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ঘটনার পর মঙ্গলবারই ছাত্রটিকে ঝাড়গ্রাম জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের কাছে হাজির করা হয়। আদালত তাকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পূর্ব মেদিনীপুরের একটি হোমে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

ঘটনাটি জানাজানি হতেই গ্রামের সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষকমহল স্তম্ভিত। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ছাত্রটির বাবা একজন প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা, যিনি বিভিন্ন সরকারি কাজের নামে ভয় দেখিয়ে টাকা তোলেন। শাসকদলের ভয়ে কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পেত না।

এই ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ঝাড়গ্রাম জেলা তৃণমূলের সভাপতি দুলাল মুর্মু এই ধরনের ঘটনাকে ‘অবাঞ্ছনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোবাইলের আসক্তি এবং সিনেমার প্রভাবকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, ঝাড়গ্রাম জেলা বিজেপির সহ-সভাপতি দেবাশিস কুণ্ডু বলেন, “এই ঘটনা প্রমাণ করে যে রাজ্যে বেআইনি অস্ত্রের ছড়াছড়ি চলছে। এর দায় তৃণমূলের নেওয়া উচিত।” সিপিএমের ঝাড়গ্রাম জেলা সম্পাদক প্রদীপ সরকার এই ঘটনাকে ‘সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং ছাত্রটির কাউন্সেলিংয়ের ওপর জোর দিয়েছেন।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদরাও ছাত্রটির কাউন্সেলিং আবশ্যিক বলে মনে করছেন এবং সমাজের এই অবক্ষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কার্তিক ঘোষের মতে, ৩৭ বছরের শিক্ষকতার জীবনে তিনি এমন ঘটনা কখনও শোনেননি।