মমতা হঠাত্ কেন ‘শ্রমশ্রী’ ঘোষণা করলেন? জেনেনিন কি বলছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা

আসন্ন নির্বাচনের আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য নতুন ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্পের ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও তার রাজনৈতিক কৌশলের পরিচয় দিলেন। এই প্রকল্পের আওতায় ভিনরাজ্য থেকে বাংলায় ফিরে আসা শ্রমিকদের নতুন কাজ না পাওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। রাজনৈতিক মহলে এই প্রকল্পকে মমতার আরেকটি ‘গেম-চেঞ্জার’ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বিরোধীদের আবারও অস্বস্তিতে ফেলেছে।
‘ভাতার রাজনীতি’ নিয়ে বিরোধীরা যতই সমালোচনা করুক না কেন, তারা সরাসরি এই প্রকল্পের বিরোধিতা করতে পারছে না। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই প্রকল্পের সমালোচনা করে বলেছেন, “৫ হাজার টাকায় সংসার চলে না। যারা প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা রোজগার করেন, তাদের কাছে এই টাকা কিছুই নয়।” একই সঙ্গে তিনি এই প্রকল্প ভোটের পর বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এই প্রকল্পের সম্পূর্ণ বিরোধিতা তিনি করেননি, যা তৃণমূলের রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশলেরই প্রমাণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই প্রকল্প ঘোষণা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক ঢিলে একাধিক পাখি মারতে চেয়েছেন। প্রথমত, পরিযায়ী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। নির্বাচন কমিশনের নতুন এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে শাসক দল যে অভিযোগ তুলছে, তার সঙ্গে এই প্রকল্প সরাসরি যুক্ত। দ্বিতীয়ত, বিজেপি যদি এই প্রকল্পের সরাসরি বিরোধিতা করে, তাহলে তৃণমূল পাল্টা প্রচার করবে যে বিজেপি বাঙালি শ্রমিকদের সাহায্যের বিরোধিতা করছে, যা তাদের ‘বাঙালি বিরোধী’ হিসেবে তুলে ধরবে।
এর আগেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন কিছু প্রকল্প রয়েছে, যা ভোটের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে:
‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’: ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে এই প্রকল্পটি ঘোষণা করে মমতা নারী ভোটারদের মন জয় করেছিলেন। রাজ্যের সব মহিলাকে মাসে ৫০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা পরে ১ হাজার টাকা করা হয়। এই প্রকল্পের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর বিজেপি সহ অন্য বিরোধী দলগুলোও ক্ষমতায় এলে একই ধরনের ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছে।
‘সবুজ সাথী’: ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নবম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের বিনামূল্যে সাইকেল দেওয়ার এই প্রকল্পটিও একটি বড় চাল ছিল। এর মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের পাশাপাশি পরিবারের বড়রাও উপকৃত হন, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে।
‘স্বাস্থ্যসাথী’: ২০১৬ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবার ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পায়। এখানেও কৌশলগতভাবে পরিবারের প্রধান মহিলা সদস্যের নামেই কার্ড তৈরি করা হয়, যা নারী ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
‘কন্যাশ্রী’: ২০১৩ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্প নারী শিক্ষায় বড় ভূমিকা রেখেছে। প্রথমে স্কুল ছাত্রীদের জন্য শুরু হলেও পরে এটি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও চালু করা হয়, যা ছাত্রীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেয় এবং বাল্যবিবাহ রোধে সাহায্য করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমেও মমতা নারী ভোটারদের মধ্যে নিজের অবস্থান আরও পোক্ত করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্পও মমতার সেই ধারাবাহিক রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ। এই ধরনের প্রকল্প দিয়ে তিনি তার নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ককে আরও শক্তিশালী করছেন এবং একই সঙ্গে বিরোধীদের অস্বস্তিতে ফেলছেন।